বাংলা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের স্থপতি সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ

বাংলা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের স্থপতি সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ
ইতিহাসের প্রতিটি বড় জাতির অভ্যুদয়ের পেছনে থাকে এক বা একাধিক যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব, যাঁরা বিক্ষিপ্ত জনপদকে একটি অভিন্ন পরিচয়ের ছাতার নিচে নিয়ে আসেন। বাঙালি জাতির ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তিত্ব হলেন চতুর্দশ শতাব্দীর সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ—স্বাধীন বাংলা সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি নিছক একজন দক্ষ শাসকই ছিলেন না; খণ্ড-বিখণ্ড লখনৌতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁওকে এক রাজনৈতিক কাঠামোয় বেঁধে তিনি বাঙালিকে দিয়েছিলেন তার প্রথম ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।

উত্থান ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আগমন

ইলিয়াস শাহের পূর্বপুরুষের শিকড় ছিল পারস্যের সিস্তান অঞ্চলে। দিল্লি সালতানাতের অস্থির রাজনীতি ও ক্ষমতার লড়াই পেরিয়ে তিনি জীবিকার সন্ধানে বাংলায় পাড়ি জমান। তখন বাংলা বিভক্ত ছিল তিনটি পৃথক শাসনাঞ্চলে—লখনৌতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁও। তিনি প্রথমে সাতগাঁওয়ের শাসক ইজ্জউদ্দীন ইয়াহিয়ার অধীনে কর্মজীবন শুরু করেন এবং নিজের সামরিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করেন। ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে লখনৌতির শাসক আলাউদ্দিন আলী শাহকে পরাজিত করে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং গ্রহণ করেন 'শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ' উপাধি—এখান থেকেই যাত্রা শুরু হয় ইলিয়াস শাহী রাজবংশের।

'শাহ-ই-বাঙ্গালাহ' ও এক অখণ্ড বাংলার জন্ম

ইলিয়াস শাহের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কীর্তি হলো সমগ্র বাংলাকে একক শাসনাধীনে আনা। ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁওয়ের শাসক ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহকে পরাজিত করার মধ্য দিয়ে তিনি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লখনৌতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁওকে একটি রাজনৈতিক সত্তায় একীভূত করেন।

এর আগ পর্যন্ত এই ভূখণ্ড পরিচিত ছিল গৌড়, বঙ্গ, রাঢ়, সমতট বা হরিকেলের মতো ভিন্ন ভিন্ন নামে, যাদের কোনো অভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। ইলিয়াস শাহই প্রথম এই খণ্ডিত ভূখণ্ডগুলোকে একত্র করে নামকরণ করেন 'বাঙ্গালাহ'। নিজেকে তিনি ঘোষণা করেন 'শাহ-ই-বাঙ্গালাহ' (বাংলার অধিপতি) এবং 'শাহ-ই-বাঙালিয়ান' (বাঙালিদের অধিপতি)। ঐতিহাসিকদের মতে, এই অঞ্চলের বাসিন্দারা সমষ্টিগতভাবে 'বাঙালি' পরিচয়ে পরিচিত হতে শুরু করে তাঁরই সময় থেকে। তাঁর এই ভূখণ্ডপ্রীতির একটি চিহ্ন আজও টিকে আছে—উত্তরবঙ্গের একটি নদীর নাম তিনি রেখেছিলেন 'বাঙালি নদী', যা এখনো একই নামে প্রবাহিত।

সামরিক বিজয় ও রাজ্যবিস্তার

বাংলার সীমানায় আবদ্ধ না থেকে ইলিয়াস শাহের সামরিক অভিযান ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতেও।

•উড়িষ্যা ও নেপাল অভিযান: ১৩৪৮ সালে উড়িষ্যা আক্রমণ করে তিনি প্রচুর ধনসম্পদ করায়ত্ত করেন। এর দুই বছর পর, ১৩৫০ সালে, দুর্গম পার্বত্য পথ অতিক্রম করে কাঠমান্ডু উপত্যকা পর্যন্ত পৌঁছে যান—হিমালয় অঞ্চলে বাংলার সামরিক শক্তির এক বিরল প্রদর্শনী।

•দিল্লির সঙ্গে সংঘাত: তাঁর ক্রমবর্ধমান প্রতিপত্তি দিল্লি সালতানাতকে উদ্বিগ্ন করে তোলে, ফলে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক বিশাল বাহিনী নিয়ে বাংলা আক্রমণ করেন। ইলিয়াস শাহ তখন একডালা দুর্গে আশ্রয় নিয়ে প্রতিরক্ষামূলক ও গেরিলা কৌশলে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রবল বর্ষা এবং দুর্গের দুর্ভেদ্যতার সামনে ফিরোজ শাহ শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হন এবং সন্ধিচুক্তির মাধ্যমে বাংলার স্বাধীন সত্তা মেনে নিয়ে দিল্লি ফিরে যান। এই যুদ্ধ বাংলার রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যকে দিল্লির কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এনে দেয়, যা পরবর্তী প্রায় দুই শতাব্দী ধরে স্বাধীন বাংলা সালতানাতের ভিত্তি সুদৃঢ় করে।

প্রশাসনিক সংস্কার ও বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা

ইলিয়াস শাহের শাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল জাতিগত ও ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসনে সর্বজনীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। দিল্লি সালতানাত যেখানে মূলত তুর্কি ও আফগান অভিজাতদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে ইলিয়াস শাহ স্থানীয় হিন্দু ও বাঙালিদের প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্তর্ভুক্ত করেন। উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো সহদেব নামের এক বাঙালি বীরকে তিনি নিজের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

সেন আমলের সংস্কৃত-কেন্দ্রিক রক্ষণশীলতার বিপরীতে মুসলিম সুলতানি শাসনে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা পেতে শুরু করে। ইলিয়াস শাহের আমল থেকেই ফার্সির পাশাপাশি বাংলা ভাষা দাপ্তরিক গুরুত্ব অর্জন করে—এই ধারাবাহিকতাই পরবর্তীকালে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগের পথ প্রশস্ত করেছিল, যার ফসল হিসেবে পরবর্তী শতকে আমরা পাই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কিংবা মঙ্গলকাব্যের ধারার বিকাশ।

উদার সমাজ, স্থাপত্য ও ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা

ইলিয়াস শাহ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও দূরদর্শী শাসক, যাঁর সুফি সাধকদের প্রতি ছিল গভীর শ্রদ্ধা। হযরত আখী সিরাজউদ্দীন (রহ.)-এর মতো প্রখ্যাত আলেম-সাধকদের জন্য তিনি মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ নির্মাণ করেন। রাজধানী পান্ডুয়ায় তাঁর নির্মিত বিখ্যাত 'সাতাশঘরা' প্রাসাদ ও একাধিক হাম্মামখানা তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের স্থাপত্যরীতিতে এক অনন্য সংযোজন ছিল, যা পরবর্তী সুলতানি স্থাপত্যরীতির—বিশেষত আদিনা মসজিদের মতো নির্মাণের—পথিকৃৎ হিসেবে কাজ করে।

১৩৫৮ খ্রিস্টাব্দে এই মহান শাসকের জীবনাবসান ঘটে। প্রায় ষোলো বছরের শাসনামলে তিনি শুধু একডালা দুর্গই রক্ষা করেননি, রক্ষা করেছিলেন বাংলার সার্বভৌম অস্তিত্ব। আজ মানচিত্রে আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশ ও গর্বিত বাঙালি জাতিসত্তা দেখি, তার প্রথম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সিস্তান থেকে আসা এই তরুণ যোদ্ধা-শাসক—সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp