নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের মহাসমাবেশ
প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক রূপ নেয় বৈশ্বিক কূটনীতির স্নায়ুকেন্দ্রে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনের সূচনা ঘিরে সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর জুড়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘হাই-লেভেল উইক’। বিশ্বনেতাদের এই বার্ষিক মিলনমেলায় সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের খলিলুর রহমান। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য নির্দ্বিধায় সময়ের দাবি: “আস্থা পুনর্গঠন ও রূপান্তর পরিচালনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ” (Restoring trust, managing transformation: A United Nations that delivers for all)।
জেনারেল ডিবেট: বৈশ্বিক বাস্তবতার আয়না
হাই-লেভেল উইকের প্রাণকেন্দ্র হলো ‘জেনারেল ডিবেট’। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিখ্যাত সবুজ মার্বেল পোডিয়াম থেকে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা তুলে ধরছেন স্ব-স্ব দেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার। চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মানবিক বিপর্যয়, জলবায়ু সংকট থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান প্রযুক্তি—বিশ্বমঞ্চের এই আলোচনার প্রধান উপজীব্য। তবে মূল কূটনীতির হিসাব-নিকাশ শুধু বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পোডিয়ামের পেছনের রুদ্ধদ্বার বৈঠক, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনাতেই তৈরি হয় বৈশ্বিক সমঝোতার রূপরেখা।
প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে জর্জরিত জাতিসংঘ
সুনির্দিষ্ট কিছু জটিলতার আবহেই আয়োজিত হচ্ছে এবারের অধিবেশন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক গোষ্ঠী ‘ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর মতে, জাতিসংঘ বর্তমানে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে নিপতিত। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা কিংবা বেসামরিক মানুষের সুরক্ষায় কূটনৈতিক প্রয়াসগুলো বারবার স্থবির হয়ে পড়ছে। উপরন্তু, টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বাজেট কাটছাঁটের ফলে সংস্থাটির জরুরি সাড়াদানের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে প্রখ্যাত বিশ্লেষক রিচার্ড গোয়ান মন্তব্য করেছেন—জাতিসংঘ হয়তো জরুরি বিভাগ থেকে বের হতে পেরেছে, কিন্তু বর্তমানে তা আটকে গেছে এক দীর্ঘমেয়াদি ‘ট্রমা সেন্টারে’, যেখান থেকে উত্তরণের পথ এখনো অনিশ্চিত। অন্যদিকে, মার্কিন-ইরান বিরোধ নিষ্পত্তিতে এই সাধারণ পরিষদকে কার্যকর মঞ্চ হিসেবে ব্যবহারের কোনো ইতিবাচক লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
ওয়াশিংটনের মেরুকরণ ও পরবর্তী মহাসচিব পদের দোলাচল
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন। জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার পাশাপাশি জাতিসংঘকে তার মূল ম্যান্ডেট—অর্থাৎ ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা’ রক্ষায় ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানাচ্ছে ওয়াশিংটন।
একই সাথে, নেপথ্যে জমে উঠেছে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের লড়াই। ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে পরবর্তী জাতিসংঘ মহাসচিব পদে কে স্থলাভিষিক্ত হবেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে প্রচ্ছন্ন কূটনীতি ও গুঞ্জন।
জলবায়ু সংকট ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্স:
প্রথাগত রাজনীতির বাইরেও এবারের অধিবেশনে গুরুত্ব পাচ্ছে বেশ কিছু আধুনিক বৈশ্বিক বিষয়:
•লিঙ্গ সমতা ও সামাজিক সূচক: ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা (UN Women) ও UN DESA যৌথভাবে লিঙ্গ সমতা সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করেছে (Gender Snapshot 2026)।
•মানবকেন্দ্রিক ডিজিটাল রূপান্তর: প্রযুক্তিভিত্তিক শাসনের বৈষম্য দূরীকরণে বিশিষ্ট অভিনেতা ও উদ্যোক্তা জোসেফ গর্ডন-লেভিট-কে জাতিসংঘের প্রথম ‘গ্লোবাল অ্যাডভোকেট ফর হিউম্যান-সেন্ট্রিক ডিজিটাল গভর্ন্যান্স’ (United Nations Global Advocate for Human-centric Digital Governance) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
•জলবায়ু ও সমুদ্রসংকট: ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর যথাক্রমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় দেশগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের সংলাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একদিকে যেমন বিশ্বনেতাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, অন্যদিকে তা জাতিসংঘের নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষার এক অগ্নিপরীক্ষাও বটে। পরাশক্তিগুলোর অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, সংঘাত নিরসনে ব্যর্থতা এবং অর্থসংকটের মাঝে দাঁড়িয়ে বিশ্বনেতারা কতটুকু কার্যকরভাবে একটি যৌথ ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরি করতে পারেন—এখন সেটাই দেখার বিষয়।