নয়াদিল্লির রাইসিনা হিলে রাষ্ট্রপতি ভবনের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লাল বেলেপাথরের দুটি বিশাল ভবন—নর্থ ব্লক ও সাউথ ব্লক—শুধু স্থাপত্যের নিদর্শন নয়; এগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভারতের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক হয়ে আছে। এর মধ্যে সাউথ ব্লক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে ভারতের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তানীতি বোঝাতে গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা প্রায়ই সরাসরি “সাউথ ব্লক” শব্দটি ব্যবহার করেন, যেমন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বোঝাতে “হোয়াইট হাউস” বলা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মেরুকরণকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও “সাউথ ব্লক” শব্দটি ঘন ঘন উচ্চারিত হচ্ছে।
১) সাউথ ব্লক আসলে কী
সাউথ ব্লক হলো ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক ভবনগুলোর একটি, যা নয়াদিল্লির রাইসিনা হিলে রাষ্ট্রপতি ভবনের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। নর্থ ব্লকের সঙ্গে এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের অংশ; দুটি ভবনই ১৯৩১ সালে উদ্বোধন করা হয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবে সাউথ ব্লকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ছিল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি তথ্যেও সাউথ ব্লকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা কৌশল এবং সর্বোচ্চ নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন একই ভবনকেন্দ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ ছিল। এই কারণেই “সাউথ ব্লক” ধীরে ধীরে কেবল একটি ভবনের নাম না থেকে ভারতের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মহলের প্রতীকী নাম হয়ে ওঠে।
তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। ভারত সরকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরকে নতুন “সেবা তীর্থ” এবং “কর্তব্য ভবন” কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করে; একই সঙ্গে নর্থ ব্লক ও সাউথ ব্লককে “যুগে যুগীন ভারত জাতীয় জাদুঘর”-এর অংশে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জাদুঘর প্রকল্পের নকশা, বাজেট ও সময়সূচি তখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে ভারতীয় সরকার জানিয়েছে।প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্থানান্তরও ধাপে ধাপে এগোচ্ছিল।
তাই ২০২৬ সালের আগস্টে সাউথ ব্লককে ভারতের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির সক্রিয় প্রশাসনিক সদর দপ্তর বলা পুরোপুরি নির্ভুল নয়। বরং বলা যায়, “সাউথ ব্লক” এখনো ভারতের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিনির্ধারণী মহলের একটি প্রচলিত প্রতীকী অভিব্যক্তি, যদিও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর একটি অংশ নতুন প্রশাসনিক কমপ্লেক্সে স্থানান্তরিত হয়েছে।
২)বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সাউথ ব্লকের ঐতিহাসিক ভূমিকা
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশনীতি নিয়ে দিল্লির নীতিনির্ধারক মহল—যাকে প্রচলিত অর্থে “সাউথ ব্লক” বলা হয়—শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকে নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ট্রানজিট ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের মতো ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা গড়ে ওঠে।
তবে এসব সহযোগিতার পাশাপাশি সম্পর্কের ভারসাম্য, ভারতের প্রভাব এবং বাংলাদেশের স্বার্থ যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল কি না—এ নিয়ে বাংলাদেশে সমালোচনাও ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে এমন এক ধরনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছিল, যেখানে দিল্লির নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ অনেক সময় অগ্রাধিকার পেয়েছে। এই মনোভাবকে কেউ কেউ “মুরুব্বিয়ানা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: বাংলাদেশনীতি কোনো একক ভবন বা প্রতিষ্ঠানের একক সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব—সব মিলিয়েই প্রতিবেশী নীতি নির্ধারিত হয়। “সাউথ ব্লক” শব্দটি সেই বিস্তৃত নীতিনির্ধারক পরিসরের একটি রূপক মাত্র।
৩) রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবস্থান
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনের পর তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং বিএনপি বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করার পর বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ প্রত্যর্পণের অনুরোধ করেছে, তবে ওই অনুরোধের বিষয়ে ভারত তখনও কোনো জবাব দেয়নি।ফলে বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে থাকে।
২০২৬ সালের আগস্টে নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। ঢাকার অভিযোগ ছিল, বাংলাদেশের আপত্তি জানা সত্ত্বেও তাঁকে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে; এ ঘটনাকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর বলেও বাংলাদেশ সরকার মন্তব্য করে।এর ফলে শেখ হাসিনার অবস্থান, তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং প্রত্যর্পণ অনুরোধ আবারও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।
এই ঘটনাগুলো থেকে বলা যায়, বাংলাদেশ ইস্যুতে দিল্লি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় নয়। তবে “সাউথ ব্লক সক্রিয় হয়ে উঠেছে”—এই বক্তব্যকে সরাসরি প্রমাণিত সত্য হিসেবে না দেখে কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া, সরকারি নীরবতা, আইনি বিবেচনা এবং দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের সমন্বিত ফল হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত।
৪)কূটনৈতিক তৎপরতা ও নতুন বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে বাংলাদেশের নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের নাম “দীনেশ ত্রিবেদী” এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম যথাক্রমে “খলিলুর রহমান”, “তারেক রহমান” ও “সালাহউদ্দিন আহমদ”—এই তথ্যগুলোর নির্ভরযোগ্য সরকারি বা প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদসূত্রে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই যাচাইযোগ্য উৎস ছাড়া এসব নাম ও বৈঠকের বিবরণকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে রাখা ঠিক হবে না।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখীকরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। চীনের সঙ্গে যোগাযোগ, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ এবং ভারতের ওপর অতিনির্ভরতা কমানোর আলোচনা—এসব বিষয় দিল্লির কৌশলগত হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট সফর বা বৈঠককে সাউথ ব্লকের উদ্বেগের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করতে হলে সরকারি বিবৃতি বা নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্র প্রয়োজন।
একজন বিশ্লেষকের সতর্কতা এখানে প্রাসঙ্গিক যে, ভারত যদি শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশনীতি পরিচালনার পুরনো কাঠামো থেকে বের হতে না পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, তিস্তা সমস্যা, সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মতো বাস্তব ইস্যুগুলোর সমাধান কেবল রাজনৈতিক বিবৃতি বা প্রতীকী প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সম্ভব নয়।
৫)পর্যালোচনা
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, বাংলাদেশ ইস্যুতে দিল্লির নীতিনির্ধারক মহল সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় নয়; তবে তার তৎপরতার ধরন বদলেছে। অতীতে যেখানে ভারত শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছিল, এখন তাকে অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হচ্ছে।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ, নয়াদিল্লি থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য এবং নতুন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজন—সব মিলিয়ে ভারত সতর্ক ও হিসাবি কূটনীতি অনুসরণ করছে বলে প্রতীয়মান হয়। এটি সক্রিয়তার একটি রূপ, কিন্তু অতীতের মতো একতরফা প্রভাব বিস্তারের রূপে নয়; বরং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে তা প্রকাশ পাচ্ছে।
সাউথ ব্লক নিছক একটি স্থাপত্যিক ভবন নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও প্রতিবেশী নীতির সঙ্গে যুক্ত নীতিনির্ধারক পরিসরের প্রতীক। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর নতুন প্রশাসনিক কমপ্লেক্সে স্থানান্তরিত হওয়ার পর সাউথ ব্লককে ভারতের বর্তমান প্রশাসনিক ক্ষমতার একমাত্র কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা আর যথাযথ নয়।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর দিল্লির বাংলাদেশনীতি নিঃসন্দেহে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া এবং প্রত্যর্পণ অনুরোধের অমীমাংসিত অবস্থান দেখায় যে দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রে এখনো রাজনৈতিক আস্থা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন রয়েছে। তাই বলা যায়, “সাউথ ব্লক” বাংলাদেশ ইস্যুতে নিষ্ক্রিয় নয়; তবে তার ভূমিকা এখন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির প্রতি সমর্থনের চেয়ে বেশি সতর্ক, প্রতিক্রিয়াশীল এবং কৌশলগত ভারসাম্যনির্ভর।