অস্ত্রের আড়ালে জ্বালানি
গাজা উপকূল থেকে প্রায় ৩০–৩৫ কিলোমিটার দূরে ভূমধ্যসাগরের তলদেশে লুকিয়ে আছে এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—“গাজা মেরিন” নামের প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রের আনুমানিক মজুত প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট, অর্থাৎ প্রায় ৩০–৩২ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস; শতভাগ না হলেও, গাজা ও পশ্চিম তীরের নিজস্ব চাহিদার তুলনায় এটি যথেষ্ট বড়, অথচ গত আড়াই দশক ধরে এটি কার্যত অব্যবহৃত রয়ে গেছে। সামরিক সংঘাত, অবরোধ ও আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ের আড়ালে বহমান এই জ্বালানি রাজনীতি বোঝা ছাড়া গাজা সংকটের অর্থনৈতিক মাত্রা পুরোপুরি বোঝা কঠিন।
গাজা মেরিন: আবিষ্কার থেকে অচলাবস্থা
২০০০ সালে ব্রিটিশ গ্যাস কোম্পানি BG Group দুটি অনুসন্ধান কূপ খনন করে গাজা মেরিন ক্ষেত্র আবিষ্কার করে; পরে এই সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও অংশীদারত্বের কাঠামো বদলেছে, এবং ২০১৮ সালে Shell প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে এবং ইসরায়েলের সম্মতিতে পরিচালিত ওই অনুসন্ধানে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সন্ধান মেলে, আর প্রাথমিকভাবে BG Group-এর হাতে ছিল ৯০ শতাংশ শেয়ার এবং ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠান Consolidated Contractors Company (CCC)-র হাতে ছিল বাকি ১০ শতাংশ। তৎকালীন ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত এই আবিষ্কারকে “ঈশ্বরের উপহার” বলে অভিহিত করেছিলেন—তবে ঘটনাক্রমে তার পরদিনই দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয়।
তবে ক্ষেত্রটির আইনি ও রাজনৈতিক অবস্থান শুরু থেকেই জটিল ছিল। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক এই অঞ্চলের লাইসেন্স ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দিলেও, তার নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক রয়ে যায়। ২০০৭ সালে গাজায় হামাসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে—ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ), হামাস কিংবা ইসরায়েল, কেউই গাজার সামুদ্রিক অঞ্চলের ওপর পূর্ণ কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ২০০৯-১০ সালে ইসরায়েলি জলসীমায় বড় আকারের গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হওয়ায় ইসরায়েলের নিজস্ব গ্যাস চাহিদা অনেকটাই মিটে যায়, ফলে ফিলিস্তিনি গ্যাসের সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে ইসরায়েলের আগ্রহও কমে আসে। ২০১৮ সালে Shell প্রকল্প থেকে সরে গেলে প্রকল্পটি কার্যত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রীয় তহবিলের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।
২০২৩ সালের অনুমোদন এবং যুদ্ধের স্থবিরতা
২০২৩ সালের জুনে ইসরায়েল গাজা মেরিন উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক অনুমোদন দেয়, তবে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে নিরাপত্তা সমন্বয়, বিশেষ করে পিএ এবং মিসরের সঙ্গে সমন্বয়, অপরিহার্য হবে। এটি যদিও চূড়ান্ত উন্নয়ন-অনুমোদন নয়। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ২০২২ সালে গৃহীত কাঠামোগত আলোচনার সম্পর্ক ছিল, যেখানে EGAS, Palestinian Investment Fund (PIF) এবং CCC-কে সম্ভাব্য উন্নয়ন-ফ্রেমওয়ার্কের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
এই আলোচনাগুলোতে মিসরের রাষ্ট্রায়ত্ত EGAS-কে প্রকল্পের অপারেশনাল বা প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের কেন্দ্রে ধরা হচ্ছিল, PIF ও CCC প্রত্যেকে ২৭.৫ শতাংশ করে এবং EGAS ৪৫ শতাংশ শেয়ার পাওয়ার সম্ভাবনার কথা ২০২২ সালের রিপোর্টে উঠে আসে। পরিকল্পনা ছিল, গ্যাসটি উপকূল থেকে মিসরের দিকে সরানো হবে, সেখানে প্রক্রিয়াকরণ শেষে তা ফিলিস্তিনি ও অন্যান্য ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হবে। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং তার পরের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এই অগ্রগতিকে হঠাৎ থামিয়ে দেয়, এবং ক্ষেত্রটির ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে ।
যুদ্ধ-পরবর্তী পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা
২০২৬ সালে গাজা মেরিনকে ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতি দেখা দেয়। রামাল্লায় PIF ও EGAS একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে, যাতে গাজা মেরিন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের পথ খুলতে পারে—এমন খবর সামনে আসে। একইসঙ্গে ফিলিস্তিনি জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ কর্তৃপক্ষের প্রধান জাফের মেলহেম জানান, চূড়ান্ত উন্নয়ন চুক্তিতে স্বাক্ষরের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। তবে এই দ্বিপাক্ষিক অগ্রগতি নিয়েও গাজার ভেতরে বিরোধ দেখা দেয়; হামাস অভিযোগ করে, গাজার প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই চুক্তি এগোচ্ছে এবং তাদের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাড়লে গাজা মেরিনসহ অন্যান্য অফশোর গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের পথ তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। Mediterranean Organization for Energy and Climate (OMEC)-এর তেল-গ্যাস পরিচালক সোহবেত কারবুজের মূল্যায়নও এই অনিশ্চয়তার দিকটি তুলে ধরে—বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যস্থতার পরও আলোচনাগুলো বারবার ভেঙে গেছে, আর যুদ্ধ গাজা মেরিনের ভবিষ্যৎ আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে। ফিলিস্তিনি বিনিয়োগ তহবিলের সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ক্ষেত্রটি উন্নয়নে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত লাগতে পারে; বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতা নিশ্চিত না হলে এমন প্রকল্পে নামা কঠিন।
বৃহত্তর আঞ্চলিক ছবি
গাজা মেরিনের ক্ষুদ্র মজুত বৃহত্তর পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় জ্বালানি প্রতিযোগিতার একটি ছোট অংশমাত্র। ইসরায়েলের লেভিয়াথান ও তামার—Chevron পরিচালিত এবং NewMed Energy ও Ratio Energies-এর অংশীদারিত্বে থাকা—এই দুই ক্ষেত্র এখন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গ্যাস চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি মিসর ও জর্ডানে রপ্তানির প্রধান উৎস। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে লেভিয়াথান সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত (FID) নেওয়া হয়, যার লক্ষ্য বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২১ বিলিয়ন ঘনমিটারে উন্নীত করা। একই সময়ে, মিসরের সঙ্গে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহ চুক্তিও কার্যকর হয় বলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি জানায়।
এই সম্প্রসারণের বিপরীতে মিসরের নিজস্ব বড় গ্যাসক্ষেত্র জোহর-এ উৎপাদন হ্রাস এবং রিজার্ভ পুনর্মূল্যায়নের কারণে চাপ তৈরি হয়েছে, ফলে দেশটি ক্রমশ আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে। এর ফলে মিসর আরও বেশি করে ইসরায়েলি গ্যাসের দিকে ঝুঁকছে—একটি বাস্তবতা, যা আঞ্চলিক জ্বালানি ভারসাম্যে ইসরায়েলকে কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে।
যুদ্ধ, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
এই আঞ্চলিক নির্ভরতা কতটা ভঙ্গুর, তা সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৩ সালের গাজা যুদ্ধের সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে তামার ক্ষেত্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়, ফলে মিসরে রপ্তানি ব্যাহত হয়। একইভাবে, বৃহত্তর নিরাপত্তা উত্তেজনার সময় ইসরায়েলের অফশোর গ্যাস অবকাঠামোও বারবার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ফলে জর্ডান, মিসর এবং অন্যান্য ক্রেতা দেশগুলো এখন বিকল্প LNG সরবরাহ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নতুন আঞ্চলিক করিডোরে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে।
মিডল ইস্টের নীতি-পর্যবেক্ষণগুলোতে বারবারই উঠে এসেছে যে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরের অফশোর গ্যাস অবকাঠামো এখন রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের অন্যতম স্পর্শকাতর লক্ষ্যবস্তু। জ্বালানি অবকাঠামো তাই কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তারও অংশ হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক অর্থনীতি
গাজা মেরিন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সম্পদ আদৌ ফিলিস্তিনিদের জন্য আশীর্বাদ, নাকি নতুন এক অভিশাপ। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষেত্রটির মজুত বৈশ্বিক মানদণ্ডে খুব বড় নয়, কিন্তু গাজা ও পশ্চিম তীরের চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ; তাই রাজস্ব বণ্টন, পুনর্গঠনে এর ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—ফাতাহ-নিয়ন্ত্রিত পিএ, হামাস, নাকি মিসর ও ইসরায়েলের তত্ত্বাবধানে কোনো যৌথ কাঠামো—এসব প্রশ্ন এখনো মীমাংসিত নয়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে গাজা মেরিন ভবিষ্যতে পুনর্গঠন অর্থায়নের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হতে পারে। একই সঙ্গে ২০২২ সালের আঞ্চলিক সামুদ্রিক সীমান্ত-ভিত্তিক সমঝোতাগুলোকে অনেকে উদাহরণ হিসেবে দেখালেও, গাজায় বাস্তব রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া জ্বালানি চুক্তি স্থায়ীভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন—এ কথা ইতিহাসই বারবার দেখিয়েছে।
গাজা মেরিনের গল্প পুরো অঞ্চলের জ্বালানি ভূ-রাজনীতির একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি—যেখানে ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা বারবার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও প্রতিদ্বন্দ্বী দাবির কাছে পরাস্ত হয়েছে। একদিকে ইসরায়েলের লেভিয়াথান-তামার অক্ষ পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি আধিপত্য গড়ে তুলছে, অন্যদিকে গাজার নিজস্ব গ্যাসসম্পদ দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে যুদ্ধ, অবরোধ ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে। ২০২৬ সালের নতুন চুক্তি-প্রচেষ্টা আশার আলো দেখালেও, হামাস-পিএ বিরোধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন সমাধান না হওয়া পর্যন্ত গাজার এই “সমুদ্রতলের উপহার” বাস্তবে পরিণত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।