গত এক দশকে মার্কিন রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এতটা বিভাজন সৃষ্টিকারী চরিত্র খুব কমই দেখা গেছে। তাঁকে নিয়ে মানুষের মূল্যায়ন প্রায় সবসময়ই দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে—একদল তাঁকে দেখেন “সাধারণ আমেরিকানদের কণ্ঠস্বর” হিসেবে, আবার আরেক দল তাঁকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংহতির জন্য হুমকি বলে মনে করেন। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জনপ্রিয়তার সূচক: নিম্নমুখী প্রবণতা
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্পের অনুমোদন রেটিং ছিল তুলনামূলকভাবে ভালো—প্রায় ৪৭ শতাংশ। তবে সময়ের সঙ্গে তা নিম্নমুখী হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের জুলাই-ভিত্তিক জরিপ অনুযায়ী, তাঁর জব অ্যাপ্রুভাল রেটিং ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা একই সময়ে সাম্প্রতিক অধিকাংশ প্রেসিডেন্টের তুলনায় কম। একই জরিপে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তাঁর প্রতি সমর্থনের ব্যবধান ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট পাওয়া গেছে—যা দলীয় মেরুকরণের গভীরতা তুলে ধরে।
পিউ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রিপাবলিকানদের ৬৯ শতাংশ ট্রাম্পের কর্মদক্ষতাকে সমর্থন করেছেন, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার মাত্র ৬ শতাংশ। উল্লেখ্য, ৩৪ শতাংশের পরিসংখ্যানটি পিউ-এর জরিপে “জুলাইয়ের মাঝামাঝি” সময়ের জাতীয় জব অ্যাপ্রুভাল রেটিং; আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন জরিপের গড়কে একই সংখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
হোয়াইট হাউস অবশ্য এসব জরিপকে প্রেসিডেন্সির দুর্বলতার প্রতিফলন হিসেবে মানতে নারাজ। প্রশাসন দাবি করে যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাদের নীতির ইতিবাচক ফল দেখা যাচ্ছে; তবে এসব দাবি প্রশাসনের নিজস্ব মূল্যায়ন হিসেবে উল্লেখ করা উচিত, স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়।
বিভাজনের কেন্দ্রে থাকা নীতিগুলো
•অভিবাসন ও আইসিই অভিযান
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হলো কঠোর অভিবাসন-প্রয়োগ অভিযান। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এবং কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করেছে, যার মধ্যে লস অ্যাঞ্জেলেসসহ কয়েকটি শহরের ঘটনা জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক মনোযোগ পায়। তবে মূল লেখায় উল্লিখিত শার্লট, নিউ অরলিন্স ও মিনিয়াপোলিসের ঘটনাগুলো, মার্কিন নাগরিকদের ভুলবশত আটকের নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং “প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণ” সম্পর্কে পৃথক ও নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক সূত্র দেওয়া হয়নি; তাই এগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে রাখা ঠিক হবে না।
ভেরা ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অভিবাসন-প্রয়োগ ও ফৌজদারি বিচারনীতি নিয়ে উদ্বেগের বিভিন্ন দিক আলোচনা করে। কিন্তু “২০২৫ সালের শুরুতে গণহারে বিতাড়নের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পরে সংখ্যাগরিষ্ঠ অসমর্থনে পরিণত হয়েছে”—এই নির্দিষ্ট দাবিটির জন্য মূল লেখায় পর্যাপ্ত জরিপ-উৎস নেই; নির্দিষ্ট জরিপ, তারিখ ও প্রশ্নের ভাষা ছাড়া দাবিটি বাদ দেওয়াই অধিকতর যথাযথ।
•ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন
লস অ্যাঞ্জেলেসসহ কয়েকটি শহরে ট্রাম্প প্রশাসনের ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন তীব্র আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে। লস অ্যাঞ্জেলেসে ফেডারেল বাহিনী ও ন্যাশনাল গার্ডকে বেসামরিক আইনপ্রয়োগে সহায়তার জন্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি ফেডারেল আদালত প্রশাসনের পদক্ষেপকে ফেডারেল আইনের পরিপন্থী এবং পসি কমিটেটাস আইনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে।
তবে মূল লেখায় শিকাগোতে মোতায়েনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের জরুরি আবেদন খারিজ করেছে—এই দাবিটির নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি; তাই এটি বাদ দেওয়া হলো। একইভাবে, “লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো, পোর্টল্যান্ড, মেমফিস ও নিউ অরলিন্স”—এই তালিকায় নিউ অরলিন্সের অন্তর্ভুক্তিরও নির্ভরযোগ্য সমর্থন পাওয়া যায়নি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস, ওয়াশিংটন, ডিসি, মেমফিস, পোর্টল্যান্ড ও শিকাগোতে মোতায়েনের কথা নথিভুক্ত হয়েছে।
কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এসব ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪৯৬ মিলিয়ন ডলার। এই অর্থের মধ্যে লস অ্যাঞ্জেলেসে ১৯৩ মিলিয়ন, ওয়াশিংটন, ডিসিতে ২২৩ মিলিয়ন, মেমফিসে ৩৩ মিলিয়ন, পোর্টল্যান্ডে ২৬ মিলিয়ন এবং শিকাগোতে ২১ মিলিয়ন ডলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতএব, “ছয় মাসে প্রায় ৪৯৬ মিলিয়ন ডলার” না লিখে “২০২৫ সালে প্রায় ৪৯৬ মিলিয়ন ডলার” লেখা অধিক নির্ভুল।
সমর্থকদের যুক্তি, এসব পদক্ষেপ অপরাধ দমন, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ এবং ফেডারেল কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য জরুরি ছিল। বিপরীতে, সমালোচকরা এগুলোকে নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার, বেসামরিক আইনপ্রয়োগে সামরিক সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ-শাসিত শহরগুলোকে লক্ষ্য করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন।
•অর্থনীতি ও শুল্কনীতি
ব্যাপক নতুন শুল্ক আরোপ ট্রাম্পের অর্থনৈতিক এজেন্ডার অন্যতম প্রধান উপাদান। প্রশাসনের দাবি, শুল্কনীতি দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিয়েছে, রাজস্ব বাড়িয়েছে এবং উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে, সমালোচকদের মতে, শুল্ক আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে ভোক্তা মূল্য ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে মূল লেখায় উল্লিখিত “২০২৬ সালের মে মাসে শুল্কনীতির কারণে স্ট্যাগফ্লেশন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল”—এই নির্দিষ্ট দাবিটির নির্ভরযোগ্য সূত্র এখানে নেই; তাই এটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে না রেখে “স্ট্যাগফ্লেশন নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল” বলা যেতে পারে, অথবা নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের সূত্র যুক্ত করা উচিত।
সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং “ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি” বা ডিওজিই-র মাধ্যমে ফেডারেল প্রশাসনে কর্মীসংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সমর্থকেরা এটিকে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন, কিন্তু সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত ছাঁটাই সরকারি সেবা ও রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দুর্বল করতে পারে। এই অংশে কর্মী ছাঁটাইয়ের নির্দিষ্ট সংখ্যা না দেওয়াই নিরাপদ, কারণ মূল লেখায় তার স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য উৎস নেই।
সমর্থক ও সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি
•সমর্থকদের যুক্তি
ট্রাম্পের সমর্থকেরা তাঁকে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখেন, যিনি প্রথাগত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের—বিশেষত শ্রমজীবী, গ্রামীণ এবং রক্ষণশীল ভোটারদের—স্বার্থ রক্ষা করছেন। তাঁরা কঠোর অভিবাসননীতি, দেশীয় শিল্প সুরক্ষা এবং “আমেরিকা ফার্স্ট” পররাষ্ট্রনীতিকে জাতীয় স্বার্থের অনুকূল বলে মনে করেন।
•সমালোচকদের যুক্তি
অন্যদিকে, সমালোচকেরা মনে করেন, তাঁর শাসনামল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেছে। ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন, কঠোর অভিবাসন অভিযান এবং নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে তাঁরা কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার লক্ষণ হিসেবে দেখেন। এগুলো রাজনৈতিক মূল্যায়ন; তাই সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও আদালতের নথির সঙ্গে পৃথকভাবে উপস্থাপন করা উচিত।
ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন রাজনীতির এমন এক চরিত্র, যাঁকে নিয়ে মধ্যপন্থী মূল্যায়ন করা কঠিন। জরিপের সংখ্যা ও নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো দেখায় যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গভীর দলীয় মেরুকরণের কেন্দ্রে অবস্থান করছেন; পিউ রিসার্চ সেন্টারের হিসাবে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের গড় দলীয় ব্যবধান ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট, যা সাত দশকেরও বেশি সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ ব্যবধানগুলোর একটি।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কেবল নীতিগত ফলাফল দিয়ে নয়, বরং নির্বাহী ক্ষমতা, অভিবাসন-প্রয়োগ, সামরিক মোতায়েন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতেও মূল্যায়িত হবে।