বিদ্রোহের অন্তরালে এক তীব্র নীরবতা

বিদ্রোহের অন্তরালে এক তীব্র নীরবতা
কাজী নজরুল ইসলাম:

বাংলা সাহিত্যে “বিদ্রোহী কবি” নামে যিনি চিরস্মরণীয়, সেই কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ছিল দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায়ে তিনি ছিলেন গর্জে ওঠা এক কণ্ঠস্বর—শাসকের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, দারিদ্র্য ও শোষণের বিরুদ্ধে। আর দ্বিতীয় অধ্যায়ে—জীবনের শেষ চৌত্রিশ বছর—তিনি ছিলেন প্রায় সম্পূর্ণ নীরব ও বাকশক্তিহীন। এই নীরবতা নিছক দুর্ভাগ্য ছিল না; এর পেছনে ছিল একের পর এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, চিকিৎসাগত সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘ সামাজিক-আর্থিক অনিশ্চয়তার করুণ ইতিহাস।

নীরবতার আগে: এক পারিবারিক বিপর্যয়ের সূচনা

নজরুলের বাকরুদ্ধতার গল্প শুরু হয় তাঁর নিজের অসুস্থতারও আগে। ১৯৪০ সালের দিকে কবিপত্নী প্রমীলা দেবী পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। স্ত্রীর চিকিৎসা ও পরিবারের ব্যয় নির্বাহের জন্য নজরুল তাঁর প্রকাশিত বইয়ের স্বত্ব বিক্রি করেন এবং গ্রামোফোন রেকর্ডের সম্মানী থেকেও অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু প্রমীলা দেবী আর সুস্থ হয়ে ওঠেননি। দীর্ঘস্থায়ী এই অসুস্থতা কবিকে মানসিক ও আর্থিকভাবে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।

এর আগেও ১৯৩০ সালে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র বুলবুল বসন্ত রোগে মারা যায়। পুত্রশোক তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে আধ্যাত্মিক সাধনার দিকে আকৃষ্ট করে। অর্থাৎ ১৯৪২ সালের আগেই নজরুলের জীবনে একের পর এক শোক জমা হচ্ছিল।

১৯৪১ সালের রহস্যময় ইঙ্গিত

১৯৪১ সালের এপ্রিলে কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির একটি অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণ দেন নজরুল। সেখানে তাঁর বক্তব্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক ধরনের বিষণ্ন পূর্বাভাসের সুর ছিল বলে পরবর্তী স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই বক্তব্যকে তাঁর আসন্ন অসুস্থতার নির্দিষ্ট বা চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক পূর্বলক্ষণ হিসেবে নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর কিছুদিন পর থেকেই তাঁর সৃজনশীল কর্মকাণ্ড দ্রুত কমে আসতে থাকে।

১৯৪২: কণ্ঠস্বর হারানোর বছর

১৯৪২ সালের জুলাই মাসে এক সাহিত্যসভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় নজরুল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাঁর আচরণ, স্মৃতি ও ভাষা ব্যবহারে পরিবর্তন দেখা দিতে থাকে। আগস্ট ১৯৪২-এর মধ্যে তিনি কার্যত বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। পরে তাঁকে মধুপুরে নেওয়া হয় এবং কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাঁকে কলকাতার লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হোমিওপ্যাথিক ও অ্যালোপ্যাথিক—বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা নেওয়া হলেও তাঁর অবস্থার স্থায়ী উন্নতি হয়নি। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকদের একটি অংশ তাঁর রোগকে “পিক্স ডিজিজ” হিসেবে শনাক্ত করেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিরল স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা ভাষা, স্মৃতি, আচরণ ও ব্যক্তিত্বে ক্রমাগত অবনতি ঘটাতে পারে। তবে নজরুলের ক্ষেত্রে রোগনির্ণয় ও তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক ও চিকিৎসাবিষয়ক সূত্রে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। 

অবহেলা ও আর্থিক দুর্দশা: এক নির্মম বাস্তবতা

নজরুলের অসুস্থতার সময় তাঁর আয়ের পথ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের কেউ কেউ চাঁদা তুলে তাঁর পরিবারের ব্যয় নির্বাহে সহায়তা করেন, কিন্তু সেই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ছিল। ১৯৪৩ সালে “নজরুল সাহায্য কমিটি” গঠিত হয় এবং কিছু সময়ের জন্য তাঁকে মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে অবিভক্ত বাংলার সরকারও তাঁর জন্য মাসিক সাহিত্যিক বৃত্তির ব্যবস্থা করে।

তবে “কোনো প্রকাশক, গ্রামোফোন কোম্পানি কিংবা সরকার তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি”—এই বক্তব্যটি অতিরঞ্জিত। কারণ তাঁর বন্ধু ও সহকর্মীরা সহায়তা করেছিলেন, সাহায্য কমিটি গঠিত হয়েছিল এবং সরকারি বৃত্তির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তাই বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অবহেলা না বলে “অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত সহায়তা” হিসেবে বর্ণনা করা অধিক যথাযথ।

কবির দুর্ভোগ এখানেই থামেনি। অসুস্থ অবস্থায় তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র কাজী অনিরুদ্ধ—পরিবারে “নিনি” নামে পরিচিত—অকালমৃত্যুবরণ করেন। এরপর ১৯৪৬ সালে তাঁর শাশুড়ি গিরিবালা দেবী নিখোঁজ হয়ে যান; তাঁর পরবর্তী পরিণতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

দেশে-বিদেশে চিকিৎসার প্রচেষ্টা

কবির আরোগ্যের আশায় একাধিক চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫২ সালে কলকাতার বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের উদ্যোগে “নজরুল নিরাময় সমিতি” গঠিত হয় এবং নজরুল ও প্রমীলা দেবীকে রাঁচির মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা সত্ত্বেও তখনও তাঁর রোগের নিশ্চিত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

১৯৫৩ সালে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তাঁকে লন্ডনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লন্ডনে পরীক্ষার পর তাঁকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় নেওয়া হয়, যেখানে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ হান্স হফ তাঁকে পিক্স ডিজিজে আক্রান্ত বলে মত দেন। চিকিৎসকেরা তাঁর সুস্থতার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করেন। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ চিকিৎসা-প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর কবি ও তাঁর স্ত্রী দেশে ফিরে আসেন।

একাকিত্বের চূড়ান্ত অধ্যায়

নজরুলকে ১৯৬০ সালে ভারত সরকার পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে—১৯৬২ সালে নয়। ততদিনে তিনি গুরুতর অসুস্থতার কারণে এই সম্মান যথাযথভাবে উপলব্ধি বা প্রকাশ করার অবস্থায় ছিলেন না। ১৯৬২ সালের ৩০ জুন প্রমীলা দেবীর মৃত্যু হলে কবির জীবনে আরেকটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়। 

১৯৭২ সালের ৪ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে এবং ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে সম্মান দেওয়া হয় এবং ঢাকায় তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অনুযায়ী তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি ঘোষণা করা হয়েছে ১৯৭২ সালের ৪ মে থেকে, যদিও এই স্বীকৃতির সরকারি গেজেট প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালে। 

ধানমন্ডিতে তাঁর জন্য একটি বাড়ির ব্যবস্থা করা হয়, যা পরে “কবি ভবন” নামে পরিচিত হয়। পরিবারের সদস্য ও পরিচর্যাকারীরা তাঁর দেখাশোনা করতেন। তবে “জীবনের শেষ দিকে কোনো আপনজন অবশিষ্ট ছিল না” বলা অতিরঞ্জিত; বরং বলা যায়, অসুস্থতার কারণে তিনি দীর্ঘ সময় প্রাত্যহিক সামাজিক ও পারিবারিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন এবং তাঁর পরিচর্যার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সেবাকর্মীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

জীবনাবসান

১৯৭৬ সালের আগস্টে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ সকাল ১০টা ১০ মিনিটে তিনি ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

তাঁর নিজের গানের ভাবনা অনুযায়ী—মসজিদের পাশে যেন তাঁকে সমাহিত করা হয়, যাতে কবর থেকেও তিনি মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পান—তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হয়। তবে “দশ হাজারেরও বেশি মানুষ” এবং “দুই দিনের শোক”—এই নির্দিষ্ট তথ্যের নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক সূত্র না থাকায় সংখ্যাটি এখানে উল্লেখ করা হলো না।

নীরবতার অন্তর্নিহিত অর্থ

নজরুলের দীর্ঘ নীরবতাকে শুধু একটি চিকিৎসাগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল সেই সময়ের সীমিত চিকিৎসাব্যবস্থা, রোগনির্ণয়ের অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট, ব্যক্তিগত শোক এবং অপর্যাপ্ত সামাজিক সহায়তা। যিনি একদিন দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কলম ধরেছিলেন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাঁকেই নিজের সবচেয়ে অসহায় সময়ে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল।

কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের শেষ চৌত্রিশ বছরের নীরবতা আমাদের সামনে প্রতিভা, অসুস্থতা, ভাগ্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক জটিল আন্তঃসম্পর্ক তুলে ধরে। এই নীরবতা তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে ম্লান করতে পারেনি; বরং তাঁর সংগ্রামী জীবনের শেষ অধ্যায় তাঁকে আরও গভীরভাবে মানবিক করে তুলেছে। “বিদ্রোহী”, “চল চল চল” কিংবা তাঁর অসংখ্য নজরুলগীতি আজও বাঙালির প্রাণে জীবন্ত—প্রমাণ করে, সত্যিকারের সৃষ্টি কখনো নীরবতায় হারিয়ে যায় না।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp