এক নদীর রাজনৈতিক গল্প
গঙ্গা শুধু একটি নদী নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এক দীর্ঘদিনের পরীক্ষাক্ষেত্র। ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে শুরু হওয়া বিতর্ক আজও শেষ হয়নি, বরং নতুন মোড় নিচ্ছে—কারণ ১৯৯৬ সালে সই হওয়া গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই ফুরিয়ে যাচ্ছে।
ফারাক্কার শুরু, বিবাদের সূত্রপাত
১৯৭৫ সালে ভারত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করে, মূল উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করা। কিন্তু এর ফল বাংলাদেশের জন্য মোটেও সুখকর হয়নি। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের কারণে পদ্মার প্রবাহ কমে যায়, এবং এর প্রভাব পড়ে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও নদীপথের নাব্যতায়। বাংলাদেশ শুরু থেকেই এই একতরফা পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে আসছিল।
১৯৭৭, ১৯৮২ ও ১৯৮৫ সালে কয়েক দফা অন্তর্বর্তী সমঝোতা হলেও কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারেনি। প্রতিবারই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় বসতে হয়েছে দুই দেশকে।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি: একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
দীর্ঘ দুই দশকের টানাপোড়েনের পর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেবেগৌড়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো শুষ্ক মৌসুমে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে) ফারাক্কা পয়েন্টে পানি ভাগাভাগির একটি সুনির্দিষ্ট সূত্র নির্ধারণ করা হয়।
তবে চুক্তিটি প্রথম থেকেই কিছুটা ব্যতিক্রমী ছিল। নদীর পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে সাধারণত স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হওয়াই রীতি, অথচ এখানে নির্দিষ্ট মেয়াদ বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে দুই পক্ষেরই মেয়াদকালে বাস্তবতা যাচাই করে ভবিষ্যতে কাঠামো সংশোধনের ইচ্ছা কাজ করেছিল।
চুক্তি নবায়নের প্রশ্নে দুই দেশ এখন কোথায়
২০২৬ সালের ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে বলে গত দুই বছর ধরেই দুই দেশের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। ২০২৪ সালের জুনে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরুর ঘোষণা আসে, এরপর যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) কর্মকর্তারা একাধিকবার দিল্লি ও ঢাকায় বৈঠকে বসেছেন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত শুষ্ক মৌসুমের পানিবণ্টন-সংশ্লিষ্ট নিজেদের দাবি ও প্রয়োজন সামনে এনেছে, আর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত একটি নিশ্চিত ন্যূনতম প্রবাহ, দীর্ঘমেয়াদি নবায়ন এবং বন্যা-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান আরও উন্নত করার।
আগস্টের শুরুতে ভারতের সংসদীয় পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিও বিলম্ব না করে নবায়ন আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার জন্য নিজ সরকারকে তাগিদ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, শুধু কূটনৈতিক বা প্রকৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নয়, এবার অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদদেরও এই আলোচনায় সম্পৃক্ত করা দরকার—কারণ গত তিন দশকে নদীর পানিপ্রবাহ, জলবায়ু পরিস্থিতি ও উজানের ব্যবহার—সব কিছুতেই বদল এসেছে।
পদ্মা ব্যারাজ: বাংলাদেশের নিজস্ব সমাধান
গঙ্গার পানি নিয়ে ভারতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ নিজেও একটি সমাধানের পথ খুঁজছে—পদ্মা নদীতে একটি বহুমুখী ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা।এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি ধরে রাখা, যাতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, সেচ ও নদীর নাব্যতা টিকিয়ে রাখা যায়। বছরের পর বছর ধরে আলোচনায় থাকা এই প্রকল্প এখন বাস্তবায়নের ধাপে এগোচ্ছে, এবং ২০২৬ সালে এর আনুষ্ঠানিক অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে
১৯৯৬ সালের চুক্তি যেমন দুই দেশের পানি কূটনীতিতে একটি মাইলফলক হয়ে উঠেছিল, তেমনি ২০২৬ সালের নবায়ন প্রক্রিয়াও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে নতুন কাঠামো দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। প্রশ্ন এখন একটাই—রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক আস্থা আর অববাহিকাভিত্তিক বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে দুই দেশ কতটা টেকসই একটি সমাধানে পৌঁছাতে পারবে। ফারাক্কার পাঁচ দশকের ইতিহাস বলে দেয়, নদীর পানি বণ্টন শুধু প্রকৌশলের বিষয় নয়—এটি আস্থা আর দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিরও পরীক্ষা।