বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা ইতোমধ্যে চালু হয়েছে। এর সঙ্গে উপকূলীয় নৌপরিবহন ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহারের চুক্তি যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত সংযোগব্যবস্থা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই ব্যবস্থায় বাংলাদেশের আর্থিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত লাভ কতটা, আর ঝুঁকিই বা কতটা?
বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হলে আবেগনির্ভর বক্তব্যের পাশাপাশি চুক্তির শর্ত, বাস্তব ব্যবহার, রাজস্ব কাঠামো এবং দুই দেশের পারস্পরিক সুবিধা—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।
চুক্তিগুলোর কাঠামো
ভারতের পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবহারের কাঠামো মূলত তিনটি ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
•অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ইউস অব চট্টগ্রাম অ্যান্ড মোংলা পোর্টস ফর মুভমেন্ট অব গুডস টু অ্যান্ড ফ্রম ইন্ডিয়া (ACMP)—এর আওতায় ভারত চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে নিজের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পায়।
•কোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্ট (CSA)—এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর আওতায় চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা ও পানগাঁও বন্দর ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
•প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (PIWTT)—এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয় ২০১৮ সালে। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষামূলক চালান এবং নিয়মিত পরিবহনের জন্য রুট, শুল্ক, কাস্টমস ও মাশুলসংক্রান্ত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়। ২০২৩ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনার মাধ্যমে দুই বন্দর ব্যবহার করে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পরিবহনের কার্যকর কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়।
এটি কি ‘ভারতের করিডোর’?
ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের বন্দর ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাচ্ছে—এটি বাস্তবতা। তবে এই কারণে বাংলাদেশের সব বন্দর ‘ভারতের কবজায়’ চলে গেছে বলা তথ্যগতভাবে অতিরঞ্জিত। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, ভারত নির্দিষ্ট চুক্তি, অনুমোদিত রুট এবং কাস্টমস প্রক্রিয়ার অধীনে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করছে; বন্দরগুলোর মালিকানা বা সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে যায়নি।
তবে উদ্বেগের জায়গা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কোনো দেশের বন্দর, নৌপথ ও স্থলপথ নিয়মিতভাবে অন্য দেশের পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হলে অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ে এবং পরিচালনাগত সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি হতে পারে। তাই প্রশ্নটি ভারতের বন্দর ব্যবহারের অধিকার নিয়ে নয়; বরং বাংলাদেশ কী শর্তে এই সুবিধা দিচ্ছে এবং বিনিময়ে কতটা লাভ করছে—তা নিয়ে।
লাভের ভারসাম্য কোথায়?
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক সুবিধা ভারত পাচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পাঠাতে ভারতের জন্য বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ও ভূখণ্ড ব্যবহার করলে দূরত্ব ও পরিবহনসময় কমতে পারে। বাংলাদেশও বন্দর মাশুল, পরিবহন ফি, কাস্টমস-সংক্রান্ত রাজস্ব এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাত থেকে আয় করতে পারে। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়লে সড়ক, রেল, নৌপথ ও বন্দর অবকাঠামোর উন্নয়নের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
কিন্তু সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা আর বাস্তব আয় এক বিষয় নয়। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা, পণ্য খালাসের দক্ষতা, সড়ক ও নৌপথের অবস্থা, পরিবহন ব্যয় এবং মাশুলের কাঠামো—এসব নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে কতটা লাভবান হবে। ২০২৩ সালের এক বিশ্লেষণে অর্থনীতিবিদ মজিবুর রহমানও মত দিয়েছিলেন যে, প্রাথমিক পর্যায়ে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় বেশি লাভবান হতে পারে।
স্বচ্ছতা ও শর্তের প্রশ্ন
চুক্তিগুলোর কয়েকটি শর্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে কার্গো ভাগাভাগি, মাশুল নির্ধারণ, কাস্টমস তদারকি, নিরাপত্তা যাচাই এবং বন্দর ব্যবহারের অগ্রাধিকার—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে কতটা রয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
তবে “চুক্তির ১৪টি অনুচ্ছেদের ৯টিতে ভারতের স্বার্থ সুরক্ষিত” কিংবা “ভারতীয় পণ্য নিয়মিত কাস্টমস পরিদর্শনের বাইরে থাকে”—এ ধরনের নির্দিষ্ট দাবির পক্ষে প্রকাশ্য ও নির্ভরযোগ্য মূল নথি না পাওয়া গেলে সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। এসব বক্তব্য থাকলে সংশ্লিষ্ট চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কপি, সরকারি পরিপত্র বা প্রামাণ্য সাক্ষাৎকার দিয়ে তা যাচাই করা দরকার।
একইভাবে, ভারতীয় জাহাজের ক্ষেত্রে পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল বা নিরাপত্তা যাচাই সীমিত করা হয়েছে—এমন অভিযোগও নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, কাস্টমস ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বিধি কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করা জরুরি।
নদীপথের ব্যয় ও বাংলাদেশের দায়
PIWTT-এর আওতায় নৌপথ সচল রাখা, নাব্যতা বজায় রাখা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো পরিচালনার ব্যয় বাংলাদেশের ওপর পড়ে—এমন অভিযোগ রয়েছে। যদি কোনো রুটের উন্নয়ন প্রধানত ট্রানজিট পণ্য পরিবহনের স্বার্থে করা হয়, তবে তার ব্যয় ও আয়ের ভারসাম্য স্পষ্টভাবে হিসাব করা দরকার।
বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় কয়েকটি বিষয় জরুরি:
•নৌপথ রক্ষণাবেক্ষণের প্রকৃত ব্যয় প্রকাশ করা।
•ভারতীয় পণ্য পরিবহন থেকে বাংলাদেশের মোট রাজস্ব নির্ধারণ ও প্রকাশ করা।
•বন্দর, সড়ক ও নৌপথ ব্যবহারের জন্য বাজারভিত্তিক এবং পুনর্বিবেচনাযোগ্য মাশুল নির্ধারণ করা।
•পরিবহন ও কাস্টমস প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
•পণ্য পরিবহনের পরিমাণ, রুট, সময় ও রাজস্বের নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা।
•নিরাপত্তা, পরিবেশ ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন করা।
পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করা
বাংলাদেশ-ভারত সংযোগব্যবস্থা একতরফা সুবিধার প্রকল্প হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। ভারতের জন্য বাংলাদেশি বন্দর ব্যবহারের সুযোগ থাকলে বাংলাদেশও ভারতের ভূখণ্ড, বন্দর বা করিডোর ব্যবহারে সমতুল্য সুবিধা পাচ্ছে কি না—এই প্রশ্নটি আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত। বর্তমানে বাংলাদেশ ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নিজের পণ্য তৃতীয় দেশে পাঠানোর সমপর্যায়ের সুবিধা পেয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
তবে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের স্বার্থে সব ধরনের ট্রানজিট বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। বরং চুক্তির শর্ত পুনর্মূল্যায়ন, মাশুলের ন্যায্যতা, পারস্পরিকতা, সংসদীয় নজরদারি এবং জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ—এসব নিশ্চিত করাই বেশি কার্যকর পথ।
রাজনৈতিক জবাবদিহিতার ঘাটতি
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সালেহ শাহরিয়ারের মতে, এই তিনটি চুক্তির কোনোটিই কখনো জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়নি, ফলে জনপরিসরে পর্যাপ্ত আলোচনা বা জবাবদিহি তৈরি হয়নি। তিনি সতর্ক করেছেন, চুক্তিগুলোর কারণে বাংলাদেশের বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমস বাহিনী কার্যত ভারতীয় স্বার্থ রক্ষার অধস্তন সংস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পার হলেও বিতর্কিত এই চুক্তিগুলো এখনো বহাল রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি এলেও এখন আবার নতুন উদ্যমে চুক্তিভিত্তিক কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়ায় সক্রিয় হয়েছে দিল্লি। রাজনীতি বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরীর প্রত্যাশা, নির্বাচিত সরকার চুক্তিগুলো সংসদে তুলে জনমতের ভিত্তিতে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করবে—তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি।