দেশজুড়ে জ্বালানি সংকট

দেশজুড়ে জ্বালানি সংকট
একটি কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন

চলতি বছরে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তা কেবল একটি দুর্ঘটনার ফল নয়—বরং বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতার একটি প্রকাশ। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র—দেশের প্রায় প্রতিটি খাতেই এখন একটি শব্দ বারবার উচ্চারিত হচ্ছে: সংকট। রাজধানীর অনেক আবাসিক এলাকায় সপ্তাহজুড়ে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার নজিরও তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

অগ্নিকাণ্ড যেভাবে সংকটকে প্রকট করে তুলল

গত ২১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগে, যাতে টার্মিনালের দুটি বয়লারের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ থাকত প্রায় ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি; দুর্ঘটনার পর তা নেমে আসে ২,০০০-২,১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে।

প্রায় একই সময়ে যুক্ত হয় দ্বিতীয় ধাক্কা—মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার জেরে কাতার এনার্জি তাদের চুক্তিবদ্ধ সরবরাহের একটি বড় অংশ কমিয়ে দেয়, যেখান থেকে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশ আসে। এর প্রভাবে নারায়ণগঞ্জের মেঘনা গ্রুপের বহু কারখানা, বিএসআরএমের ইস্পাত কারখানা এবং নরসিংদীর অধিকাংশ টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে যায়। শুধু নরসিংদী শিল্পাঞ্চলেই দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০০-৫০০ কোটি টাকা, আর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায় প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট, ফলে একদিন লোডশেডিং ছড়িয়ে পড়ে ৩,৭০০ মেগাওয়াটেরও বেশি এলাকায়।

সমস্যার শিকড় অনেক পুরনো

তবে এই অগ্নিকাণ্ড মূলত একটি উপলক্ষ মাত্র; প্রকৃত সমস্যা অনেক গভীরে প্রোথিত। দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন গত এক দশক ধরে ক্রমাগত কমছে—২০১৭ সালে দৈনিক উৎপাদন যেখানে ছিল প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট, ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৬০-১৬৩ কোটি ঘনফুটে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের অবশিষ্ট গ্যাসমজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই দশকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে ২০১৮ সাল থেকে সরকার আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা স্বল্পমেয়াদে সহজ সমাধান মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে, আর এই সরবরাহব্যবস্থা মূলত দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল, যাদের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এত বড় একটি অর্থনীতির জ্বালানি নিরাপত্তা যখন মাত্র দুটি স্থাপনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন একটিতে বিপর্যয় ঘটলে পুরো ব্যবস্থা কেঁপে ওঠাই স্বাভাবিক। এলপিজির ক্ষেত্রেও চিত্র প্রায় একই রকম—দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৯৮-৯৯ শতাংশই আমদানিনির্ভর, দেশীয় উৎপাদন নগণ্য।

আমদানিনির্ভরতার আর্থিক মূল্য

এই আমদানিনির্ভরতার খরচও কম নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে, আর স্পট মার্কেটে দামের অস্থিরতা এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের পর এলএনজির স্পট মূল্যে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়, যার একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত সরকারকে ভর্তুকি হিসেবে বহন করতে হচ্ছে—যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

বঙ্গোপসাগরে অব্যবহৃত সম্ভাবনা

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০১২-১৪ সালে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মামলায় জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে বিশাল একটি সমুদ্র এলাকার মালিকানা লাভ করে। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনো তেল-গ্যাস মজুত আবিষ্কৃত হয়নি, অথচ পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার তাদের শ্বে গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত গ্যাস চীনে রপ্তানি করছে। বর্তমানে সরকার বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে—১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্রে—আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে অনুসন্ধানের আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং শর্তাবলি আগের তুলনায় সহজ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দরপত্র আহ্বানই যথেষ্ট নয়—চুক্তি সম্পাদন থেকে অনুসন্ধান, কূপ খনন ও গ্যাস আবিষ্কার পর্যন্ত সময় লাগতে পারে পাঁচ থেকে সাত বছর।

সমাধানের সম্ভাব্য পথ

স্বল্পমেয়াদে নতুন এফএসআরইউ ভাড়া নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের মেরামত দ্রুত শেষ করাই তাৎক্ষণিক করণীয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে সমাধানের পথ স্পষ্ট—দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা, বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, একক নির্ভরতা এড়িয়ে একাধিক অপারেটরের মধ্যে সরবরাহব্যবস্থা ছড়িয়ে দেওয়া এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়া। একটিমাত্র টার্মিনালে দুর্ঘটনার প্রভাবে যদি জাতীয় অর্থনীতি নড়বড়ে হয়ে পড়ে, তাহলে এই কাঠামোর ভঙ্গুরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক। মূল প্রশ্নটি এখন এখানেই—এই সংকট থেকে বাংলাদেশ প্রকৃত কাঠামোগত সংস্কারের দিকে এগোবে, নাকি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুরনো ঢিলেঢালা নীতিতেই ফিরে যাবে।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp