ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে যে ইস্যুটি বারবার ফিরে এসেছে, তার নাম সংখ্যালঘু নিরাপত্তা। প্রায় আঠারো মাসের অন্তর্বর্তী শাসন পেরিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি নির্বাচিত সরকার পেয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার এই পালাবদলেও ইস্যুটি অদৃশ্য হয়নি। বরং ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা শুধু মানবাধিকারের প্রশ্ন নয়—এটি দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী হাতিয়ারও বটে।
ঘটনার সূত্রপাত ও ক্ষমতার পালাবদল
হাসিনার পতনের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূসকে অভিনন্দন জানিয়ে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আশা প্রকাশ করেন। ঢাকার সংবাদমাধ্যমের একাংশ এই বার্তাকে ভিন্নভাবে দেখেছে—রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রতি ভারতের অস্বস্তি ও বিব্রতবোধই কূটনৈতিক ও গণমাধ্যম মঞ্চে সংখ্যালঘু-উদ্বেগের ভাষায় প্রকাশ পেয়েছিল বলে তাদের ভাষ্য।
২০২৪ সালের ৪ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো সারাদেশে দুই হাজারের বেশি হামলার ঘটনা রিপোর্ট করে, যার মধ্যে ৬৯টি মন্দিরে হামলার ঘটনাও ছিল। তবে সবচেয়ে আলোচিত নয়টি হত্যাকাণ্ডের পেছনে স্পষ্ট ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের প্রমাণ মেলেনি বলে একটি স্বাধীন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে; বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা ও সাধারণ অপরাধের মিশ্রণ এসব ঘটনার পেছনে কাজ করেছিল। দুই সেটের তথ্যের এই ফারাকই বুঝিয়ে দেয়, কেন এই ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা এত কঠিন।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট ৩৫০ আসনের সংসদে ২১২টি আসনে জয় পায় এবং জামায়াতে ইসলামী-নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পায়। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন—প্রায় দুই দশক পর বিএনপির ক্ষমতায় ফেরা এবং ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার মুহূর্ত। ভারতের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী মোদির একটি ব্যক্তিগত বার্তা তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন, যাতে তাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়—দিল্লি নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী, এই বার্তাই তাতে স্পষ্ট ছিল।
দিল্লির বয়ান বনাম ঢাকার পাল্টা-বয়ান
হাসিনা-পরবর্তী সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যম, থিঙ্কট্যাংক ও রাজনীতিবিদদের একাংশ বাংলাদেশকে ক্রমাগতভাবে এমনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন যেন দেশটি সংখ্যালঘু নিপীড়নকারী এবং চরমপন্থার দিকে ধাবমান একটি রাষ্ট্র—এমনটাই যুক্তি দেন আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত একাধিক বিশ্লেষণের লেখকরা। তাদের দাবি, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশ অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সংখ্যালঘু অধিকারের স্পর্শকাতর বিষয়টি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়েছে। তাদের মতে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চ্যালেঞ্জ থাকলেও দেশটি অসহিষ্ণু নয়, এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বেশিরভাগ ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করেছে, ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়।
ভারতের দিক থেকে চিত্রটা ভিন্ন। নয়াদিল্লিভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ORF) ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ ভি পন্থের মতে, হাসিনার বিদায়ের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা ভারতে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে এবং সরকারের ওপর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ বাড়িয়েছে। তার ভাষ্যে, বাংলাদেশে চরমপন্থী কণ্ঠস্বরকে বেড়ে উঠতে দেওয়া হয়েছে।
দুই বয়ানের এই সংঘাত স্পষ্ট করে দেয়—একই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দুই দেশের গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকরা কতটা ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেন, যখন তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ ভিন্ন দিকে টানে।
প্রতিনিধিত্বের সংখ্যাতাত্ত্বিক ফারাক
সিঙ্গাপুরের থিঙ্কট্যাংক আরএসআইএস-এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮-৩০ শতাংশ থেকে কমে এখন প্রায় আট শতাংশে দাঁড়িয়েছে—২০২২ সালের শুমারি অনুযায়ী প্রায় ১.৩১ কোটি মানুষ। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে মাত্র চারজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, সবাই বিএনপির টিকিটে—দুজন হিন্দু (গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও নিতাই রায় চৌধুরী), একজন চাকমা (দীপেন দেওয়ান) ও একজন মারমা (সাচিং প্রু)। জনসংখ্যার অনুপাতে তিনশো আসনের সরাসরি নির্বাচিত সংসদে প্রায় পঁচিশজন সংখ্যালঘু সদস্য থাকার কথা ছিল। এই সংখ্যাগত ফারাক ভারতের কাছে একটি শক্তিশালী যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যদিও প্রতিনিধিত্বের ঘাটতির পেছনে নির্বাচনী ব্যবস্থা, দলীয় মনোনয়ন-প্রক্রিয়া এবং সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের রাজনৈতিক বিভাজনসহ একাধিক কাঠামোগত কারণও কাজ করে থাকতে পারে, যা কেবল "নিপীড়ন" তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা সরলীকরণ হয়ে যায়।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশ
এই ইস্যু ভারতের দেশীয় নির্বাচনী রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপি বাংলাদেশ প্রসঙ্গকে কর্মসংস্থান, অপরাধ, দুর্নীতি ও কল্যাণ-ফাঁকফোকর নিয়ে স্থানীয় উদ্বেগের সঙ্গে জাতীয় ক্ষতির বৃহত্তর আখ্যানে জুড়ে দিয়েছে, যা বিশ্লেষণ করেছে স্ক্রল.ইন। এর ফলে হিন্দু ভোটব্যাংক সংহত করার প্রক্রিয়াকে সংখ্যাগুরুবাদী আগ্রাসনের বদলে আত্মরক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে—যদিও একই বিশ্লেষণ এটাও স্বীকার করে যে বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং ইসলামপন্থী সংগঠনের তৎপরতা নিছক রাজনৈতিক আবিষ্কার নয়, বরং বাস্তব উদ্বেগ।
ভারতের সীমান্তবর্তী পাঁচটি রাজ্যই এখন বিজেপি বা তার মিত্রদের শাসনাধীন, এবং অবৈধ অভিবাসন-বিরোধী বক্তব্য দলটির রাজনৈতিক কৌশলের একটি কেন্দ্রীয় অংশ হয়ে উঠেছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) প্রতিবেশী দেশগুলোর অ-মুসলিম সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে জাতির ধারণাকে সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করেছে, যা ধর্মনিরপেক্ষ বহুত্ববাদী কাঠামোর বদলে একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামোর সঙ্গে নাগরিকত্বের ধারণাকে সংযুক্ত করেছে বলে সমালোচকরা মনে করেন।
কূটনৈতিক জটিলতা ও চীন-ফ্যাক্টর
সংখ্যালঘু ইস্যু এককভাবে কাজ করছে না—এটি জড়িয়ে আছে আরও বড় কৌশলগত প্রতিযোগিতার সঙ্গে। হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য বাংলাদেশ বহুবার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও ভারত এখনো তাতে সাড়া দেয়নি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের একটি আদালত ২০২৪ সালের গণআন্দোলন দমনে ভূমিকার জন্য হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, যা প্রত্যর্পণ-প্রশ্নকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের একটি প্রধান কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একই সময়ে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে, যা ভারতের জন্য অতিরিক্ত কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নির্বাচিত সরকারের অধীনে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
তারেক রহমান সরকার শপথ নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে সতর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা দেখা গেছে। ২০২৬ সালের ৭-৮ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মধ্যে নয়াদিল্লিতে বৈঠক হয়, যেখানে দুই পক্ষ সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর অঙ্গীকার করে। তবে এই অঙ্গীকার সহজে বাস্তবায়িত হয়নি। ১৫-১৬ জুন তারেক রহমানের এক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানকে নয়াদিল্লির বিমানবন্দরে ভারতীয় কর্মকর্তাদের হাতে অসম্মানজনক আচরণের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ ওঠে, যার জেরে বাংলাদেশ ভারতের উপ-হাইকমিশনারকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। প্রায় একই সময়ে তারেক রহমানের চীন সফরের পরিকল্পনার খবরও প্রকাশ্যে আসে, যা সম্পর্কের ভঙ্গুরতাকেই আবার সামনে নিয়ে আসে। তারপরও ৯-১০ আগস্ট রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য একটি "অনুকূল পরিবেশ" তৈরির আহ্বান জানান—যা বোঝায়, সম্পর্কের টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই পক্ষই কূটনৈতিক দরজা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে চাইছে না।
অর্থাৎ, ক্ষমতা পরিবর্তনের পরও সংখ্যালঘু-নিরাপত্তা, হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং চীন-সংযোগ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে জড়িয়ে থেকে সম্পর্ককে একই সময়ে উষ্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ রাখছে।
বাস্তবতা কোথায়
সব সূত্র একত্রে পড়লে একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে—সংখ্যালঘু নিরাপত্তা বাংলাদেশে একটি প্রকৃত ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, কিন্তু একই সঙ্গে এটি দুই দেশেই রাজনৈতিক পুঁজি আদায়ের একটি সুবিধাজনক আখ্যানে পরিণত হয়েছে। ভারতের জন্য এটি অভ্যন্তরীণ ভোটব্যাংক সংহত করা এবং প্রতিবেশী দেশের ওপর কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার হাতিয়ার। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি প্রতিরক্ষামূলক বয়ান, যা দিয়ে প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকারের এবং পরে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টাকে প্রতিহত করা যায়। ক্ষমতার পালাবদল ইস্যুটির রাজনৈতিক ব্যবহারকে থামায়নি, শুধু এর মঞ্চ ও চরিত্র বদলেছে। এই দুই বয়ানের মাঝখানে আসল ভুক্তভোগী—বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী—প্রায়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু না হয়ে দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়।