রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে জটিল ভূরাজনৈতিক অঞ্চলগুলোর একটি। ভারতের ত্রিপুরা-মিজোরাম এবং মিয়ানমারের চিন রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা এই এলাকায় জাতিগত বৈচিত্র্য, অসম্পূর্ণ শান্তিচুক্তি, ভূমি-বিরোধ এবং সশস্ত্র তৎপরতা—সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। প্রশ্নটা তাই একরৈখিক নয়—এখানে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বার্থ এবং উন্নয়ন-বঞ্চনা একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি: কেএনএফ এখনো সক্রিয়
কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ২০২৪ সালের এপ্রিলে বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে ব্যাংক ডাকাতি, অস্ত্র লুট ও ব্যাংক ব্যবস্থাপক অপহরণের ঘটনার পর থেকে জাতীয় আলোচনায় আসে। এরপর যৌথ বাহিনীর টানা অভিযানে সংগঠনটির চিফ কোঅর্ডিনেটরসহ বহু সদস্য গ্রেপ্তার হয়, অস্ত্র উদ্ধার হয় এবং প্রশিক্ষণ ঘাঁটি ভেঙে দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচিতে অভিযান চলমান, এবং সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী সন্দেহভাজন ৫৫ জনের বেশি কেএনএফ সদস্য ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে যে সংগঠনটির সাংগঠনিক সক্ষমতা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর তৎপরতা পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।
বহিঃশক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ: কী বলা হচ্ছে, আর কী প্রমাণিত
সরকারের কিছু শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির বক্তব্যে সরাসরি ভারত ও মিয়ানমারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে। গত আগস্টে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সেমিনারে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর পাহাড়কে ঘিরে "বিদেশি শক্তির গভীর ষড়যন্ত্র" চলছে বলে মন্তব্য করেন এবং কঠোর সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। একই মঞ্চে অন্য বক্তারাও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ইন্ধনে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ তোলেন।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর বাস্তব কৌশলগত স্বার্থ
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে প্রতিবেশীদের বাস্তব ভূ-কৌশলগত স্বার্থ আছে, যা যেকোনো নীতিনির্ধারণে বিবেচনায় রাখা দরকার:
ভারতের দিক থেকে: ত্রিপুরা-মিজোরামে জাতিগত সংযোগ, সীমান্তপারের চলাচল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিজস্ব বিদ্রোহ-সংক্রান্ত নিরাপত্তা-উদ্বেগ ভারতের আগ্রহের পেছনে কাজ করে।
মিয়ানমারের দিক থেকে: চিন ও রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত সীমান্তে অস্ত্র চোরাচালান, সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল এবং সম্ভাব্য শরণার্থী স্রোতের ঝুঁকি তৈরি করে।
এই স্বার্থগুলো "ষড়যন্ত্র" না হয়েও বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে—সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে অস্ত্র বা যোদ্ধা চলাচল ঘটতেই পারে, তা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও সম্ভব। তাই নীতিনির্ধারণে "রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র" আর "আঞ্চলিক অব্যবস্থাপনার সুযোগ নেওয়া অপরাধী নেটওয়ার্ক"—এই দুটি সম্ভাবনাকে আলাদা করে দেখা দরকার।
দুর্যোগ ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা: সমস্যার আরেকটি স্তর
২০২৬ সালের বর্ষায় বান্দরবানসহ পার্বত্য এলাকায় ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস হয়েছে—একাধিক উপজেলার হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছে এবং একাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। সড়ক, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ-অবকাঠামোর দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিদ্যুৎ-অবকাঠামো ঋণের মতো উদ্যোগ ইতিবাচক, কিন্তু একক প্রকল্প দিয়ে দশকের পর দশকের উন্নয়ন-বঞ্চনা দূর হবে না।
সমাধান: বাংলাদেশ কীভাবে এই পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনা করতে পারে
একটি কার্যকর কৌশল একমাত্রিক (শুধু সামরিক) হতে পারে না। নিচে কয়েকটি স্তরে করণীয় তুলে ধরা হলো:
১. রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তর
১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির অসম্পূর্ণ ধারাগুলো (ভূমি কমিশন, প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর) নিয়ে পক্ষগুলোর সঙ্গে সময়াবদ্ধ, স্বচ্ছ পুনরালোচনা শুরু করা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো, যাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বাস্তবে অনুভূত হয়।
ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন, বহু-পক্ষীয় ভূমি কমিশন সক্রিয় করা—এটি অসন্তোষের অন্যতম বড় উৎস।
২. নিরাপত্তা স্তর
সামরিক অভিযানকে শুধু দমনমূলক না রেখে গোয়েন্দা-নির্ভর, লক্ষ্যভিত্তিক করা, যাতে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর বিরূপ প্রভাব কম পড়ে।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা (বিজিবি সক্ষমতা, নজরদারি প্রযুক্তি) শক্তিশালী করা, যাতে অস্ত্র-চোরাচালান ও অনিয়ন্ত্রিত সীমান্ত-পারাপার ঠেকানো যায়।
সশস্ত্র আত্মসমর্পণকারীদের জন্য বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন কর্মসূচি রাখা, যা অতীত অভিজ্ঞতায় আংশিক সফল হয়েছে।
৩. কূটনৈতিক স্তর
ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত-নিরাপত্তা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য-বিনিময় চ্যানেল জোরদার করা, যাতে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বদলে যাচাইযোগ্য সহযোগিতা তৈরি হয়।
নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া প্রকাশ্য "ষড়যন্ত্র" বয়ান পরিহার করা—কূটনৈতিক আস্থা নষ্ট করে এমন বক্তব্যের বদলে প্রমাণভিত্তিক, নিয়ন্ত্রিত পথে অভিযোগ উত্থাপন করা।
৪. উন্নয়ন স্তর
সড়ক, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করা, বিশেষত দুর্গম উপজেলাগুলোতে।
দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো (বন্যা-প্রতিরোধী সড়ক, পূর্ব-সতর্কীকরণ ব্যবস্থা) অগ্রাধিকার দেওয়া, যেহেতু জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
পরিকল্পিত, স্থানীয় জনগোষ্ঠী-নিয়ন্ত্রিত পর্যটন মডেল গড়ে তোলা, যাতে অর্থনৈতিক সুফল স্থানীয়ভাবে থাকে।
৫. তথ্য ও জনমত স্তর
সরকারি বক্তব্য ও গণমাধ্যম প্রতিবেদনে অভিযোগ ও প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা, যাতে জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সামষ্টিকভাবে সন্দেহভাজন না হয়ে পড়ে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ, যাতে নিরাপত্তা-অভিযান আর সামষ্টিক শাস্তির মধ্যে পার্থক্য বজায় থাকে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতা একটিমাত্র কারণে সৃষ্ট নয়—এটি অসম্পূর্ণ শান্তিচুক্তি, ভূমি-রাজনীতি, কেএনএফের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর বাস্তব কৌশলগত স্বার্থ, এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন-বঞ্চনার সমষ্টিগত ফল। বিদেশি সম্পৃক্ততার অভিযোগ গুরুত্বসহকারে তদন্ত হওয়া উচিত, কিন্তু তা প্রমাণ ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রচার করা নীতিনির্ধারণে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। টেকসই সমাধান নির্ভর করবে শান্তিচুক্তির প্রকৃত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ নিরাপত্তা-নীতি, কূটনৈতিক পরিপক্বতা এবং অবকাঠামো-উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগের ওপর—একক সামরিক সমাধানে নয়।