বাগেরহাটের রামপাল যখন সেপ্টেম্বরের ভ্যাপসা গরমে বিপর্যস্ত, তখন দেশের অন্যতম বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে এর কারণ হিসেবে বয়লারের অতিরিক্ত উত্তাপ ও কারিগরি ত্রুটির কথা জানানো হয়েছে।
তবে একটি যান্ত্রিক বিভ্রাটই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর একটি বড় দুর্বলতা সামনে এনেছে—গুরুতর কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে জরুরি মেরামতের জন্য কেন্দ্রটিকে এখনো বিদেশি বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
কী ঘটেছিল
১৩ সেপ্টেম্বর রোববার সকাল ১১টার দিকে রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রকল্পের ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। কারণ হিসেবে জানানো হয়, বয়লার অতিরিক্ত গরম হয়ে পড়েছিল এবং সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছিল আরও কিছু কারিগরি জটিলতা। কেন্দ্রের ১৩২০ মেগাওয়াট মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক এতে হারিয়ে যায়—১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন থেকে সরবরাহ নেমে আসে ৬০০ মেগাওয়াটের নিচে।
স্বাভাবিকভাবেই এই ঘাটতির প্রভাব গিয়ে পড়ে জাতীয় গ্রিডে। বাগেরহাট, খুলনা, বরিশাল অঞ্চলে শুরু হয় দফায় দফায় লোডশেডিং। ওজোপাডিকোর হিসাব অনুযায়ী, ঘটনার তিন দিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে খুলনা-বরিশাল অঞ্চলে ৮০৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা গিয়েছিল মাত্র ৬২৯ মেগাওয়াট—অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ১২৯ মেগাওয়াট। খুলনা জোনেই একাই ঘাটতিহ ছিল ১২৪ মেগাওয়াট। অথচ বিভ্রাটের আগের দিন, ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে এই অঞ্চলে চাহিদা ও সরবরাহে কোনো ফারাকই ছিল না। একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার প্রভাব যে কতটা তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক হতে পারে, এই পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ।
মেরামতে বিলম্ব
কর্তৃপক্ষ শুরুতে আশ্বাস দিয়েছিল, বিদেশ থেকে দুজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী এলেই বয়লারের ত্রুটি সারিয়ে তোলা সম্ভব হবে, এবং তাতে সময় লাগবে তিন থেকে চার দিন। রামপাল কেন্দ্রের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা আনোয়ারুল আজিম জানিয়েছিলেন, দেশীয় প্রকৌশলীরা ইতিমধ্যে বয়লারের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছেন, তবে চূড়ান্ত মেরামতের জন্য ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলামও একই তথ্য নিশ্চিত করেছিলেন—ইউনিটটি তখন "কুল ডাউন" পর্যায়ে ছিল, অর্থাৎ প্রধান মেরামত কাজ শুরুর আগেই সেটিকে ঠান্ডা করার প্রক্রিয়া চলছিল।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিশ্রুত সেই দুই প্রকৌশলী এসে পৌঁছাননি। বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল পর্যন্তও তাদের বাংলাদেশে আসার কোনো নিশ্চিত খবর ছিল না। ফলে যে মেরামত কাজ তিন-চার দিনে শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা চতুর্থ দিনেও শুরু করা যায়নি পুরোদমে। কবে নাগাদ ইউনিটটি পূর্ণ উৎপাদনে ফিরবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা কর্তৃপক্ষ দিতে পারছে না—একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা কীভাবে একটি লজিস্টিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।
একটি পুরনো প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি
এই বিভ্রাট বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ২০২৪ সালের ১২ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে রামপাল কেন্দ্রটি এ পর্যন্ত ৩০ বারের বেশি বন্ধ হয়েছে বিভিন্ন কারিগরি কারণে। অথচ কেন্দ্রটি কখনোই তার পূর্ণ ১৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি। এই বারবার বিভ্রাটের ধরন প্রশ্ন তোলে—সমস্যাটা কি স্রেফ যান্ত্রিক নাকি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা?
আকর্ষণীয় বিষয় হলো, একই সপ্তাহে ভারতের আদানি গোষ্ঠীর পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও কারিগরি ত্রুটির কারণে তিন দিন বন্ধ ছিল, যা রামপালের ইউনিট বন্ধ হওয়ার একই দিনে আবার সচল হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের গ্রিডের একটি বড় অংশ যেসব উৎস থেকে বিদ্যুৎ পায়, তার একাধিকটিই একই সময়ে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছিল—যা জাতীয় গ্রিডের সামগ্রিক ভঙ্গুরতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। উল্লেখ্য, দুর্ঘটনার দিন সারা দেশে মোট লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ১৩৯ মেগাওয়াটে, যা রামপালের একটিমাত্র ইউনিট বন্ধ হওয়ার প্রভাবের চেয়ে অনেক বড় একটি চিত্র তুলে ধরে।
যৌথ মালিকানার কেন্দ্র, একতরফা নির্ভরতা
রামপাল কেন্দ্রটির গল্প শুরু হয় ২০১০ সালে, যখন বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে এই মেগা প্রকল্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও ভারতের এনটিপিসির মধ্যে সমঝোতা সইয়ের পর গঠিত হয় বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল)। প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট উৎপাদনে যায় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে, দ্বিতীয়টি ২০২৩ সালের অক্টোবরে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়।
এই যৌথ মালিকানার কাঠামোতেই লুকিয়ে আছে বর্তমান সংকটের মূল সূত্র। কেন্দ্রটি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে থাকলেও এর কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের সিদ্ধান্ত এবং বিশেষজ্ঞ জনবল—দুটোই এখনো অনেকাংশে ভারত-নির্ভর। ফলে যখনই কোনো জটিল কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়, সমাধানের গতি নির্ভর করে সীমান্তের ওপার থেকে বিশেষজ্ঞ পাঠানোর প্রক্রিয়ার ওপর—আর সেই প্রক্রিয়া যদি দেরি করে, তার মাশুল টানতে হয় দেশের সাধারণ গ্রাহককে।
জ্বালানি-নিরাপত্তার প্রশ্ন
জ্বালানি খাতে বিশেষজ্ঞ জনবল বা প্রযুক্তি বিদেশ থেকে আনা কোনো নতুন ঘটনা নয়—বিশ্বজুড়েই এটি স্বাভাবিক চর্চা। কিন্তু জাতীয় গ্রিডের এক-দশমাংশের বেশি সরবরাহ যে কেন্দ্র একাই বহন করে, সেই কেন্দ্রের একটি নিয়মিত কারিগরি সমস্যার সমাধান যদি একটিমাত্র বৈদেশিক সরবরাহ-শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেটি নিছক প্রযুক্তিগত ইস্যু থাকে না—হয়ে ওঠে জ্বালানি-নিরাপত্তার প্রশ্ন। কোনো একদিন যদি কূটনৈতিক টানাপোড়েন, ভিসা জটিলতা কিংবা লজিস্টিক বাধার কারণে এই বিশেষজ্ঞ প্রবাহ বিলম্বিত হয়, তার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে দেশের কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি বড় অংশই ভারত-নির্ভর—রামপাল ছাড়াও আদানির ঝাড়খণ্ড কেন্দ্র এবং ত্রিপুরা-কুমিল্লা আন্তঃসীমান্ত সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে সরাসরি আমদানি করা বিদ্যুৎ মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতীয় উৎসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই নির্ভরতা স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করলেও, যেকোনো একক উৎসে সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব সহজেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
সামনের পথ
রামপালের এই বিভ্রাট আসলে একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে দেশকে—জ্বালানি খাতে আমদানিকৃত প্রযুক্তি ও বিদেশনির্ভর দক্ষ জনবলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কতটা টেকসই? বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, স্থানীয় প্রকৌশলীদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ, কেন্দ্রভিত্তিক জরুরি প্রযুক্তিগত মজুত এবং বিকল্প রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি ছাড়া এই ধরনের বিভ্রাট বারবার ফিরে আসতে থাকবে। যতদিন না দেশীয় সক্ষমতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে জরুরি কারিগরি সমস্যার সমাধানে একক কোনো বিদেশি উৎসের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে না হয়, ততদিন প্রতিটি বয়লার-বিভ্রাটই থেকে যাবে জাতীয় গ্রিডের জন্য একটি নীরব হুমকি হয়ে।