পূর্ববঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন যারা

পূর্ববঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন যারা
১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ মোটেও সহজ ছিল না। প্রায় এক দশক ধরে নানা মহলের তীব্র বিরোধিতা পেরিয়ে তবেই এটি বাস্তবে রূপ নেয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই বিরোধিতা এসেছিল মূলত তিন ধরনের গোষ্ঠীর কাছ থেকে—যাদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ছিলেন।

প্রেক্ষাপট: বঙ্গভঙ্গ ও তার রদ

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ভারতে আধুনিক উচ্চশিক্ষার সূচনা হয়। সে বছরই বড়লাট লর্ড ক্যানিং 'দ্য অ্যাক্ট অফ ইনকরপোরেশন' পাস করে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজ—এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন ইউরোপীয় মডেলে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন মূলত পশ্চিমবঙ্গের উচ্চবিত্ত হিন্দু পরিবারের সন্তানরা। ১৯০৫ সালের আগে অবিভক্ত বাংলায় মোট ১৯টি কলেজ থাকলেও পূর্ব বাংলায় ছিল মাত্র নয়টি—যা এ অঞ্চলের জনসংখ্যার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে আলাদা প্রদেশ গঠিত হলে পিছিয়ে পড়া মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু মাত্র ছয় বছরের মাথায়, ১৯১১ সালে, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু নেতাদের প্রবল আন্দোলনের মুখে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। এতে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়—তারা মনে করতেন অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। এই ক্ষতিপূরণ হিসেবেই ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ, ১৯১২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা সফরকালে।

যে তিন শ্রেণির মানুষ বিরোধিতা করেছিলেন

লেখক ও প্রাবন্ধিক কুলদা রায় তাঁর 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ও রবীন্দ্রনাথ' প্রবন্ধে এই বিরোধিতাকারীদের তিন ভাগে ভাগ করেছেন।

১. পশ্চিমবঙ্গের কিছু মুসলমান

তাঁরা মনে করতেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের কোনো লাভ হবে না, বরং পূর্ববঙ্গের মুসলমানরাই উপকৃত হবেন। তাই তাঁদের যুক্তি ছিল—বিশ্ববিদ্যালয় হলে সেটা পশ্চিমবঙ্গেই হওয়া উচিত।

২. পূর্ব বাংলার কিছু মুসলমান

এই দলটির যুক্তি ছিল ভিন্ন। তখন পূর্ববঙ্গে প্রতি দশ হাজার মুসলমান ছাত্রের মধ্যে মাত্র একজন স্কুল স্তর পার হতে পারত। কলেজ পর্যায়ে ছাত্রসংখ্যা এতটাই কম ছিল যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা নগণ্যই থেকে যেত। তাঁদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে আগে দরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বিস্তার। আশঙ্কা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ ব্যয় হয়ে গেলে নতুন প্রাথমিক-মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ার সুযোগ থাকবে না, উল্টো বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোও অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

এই মতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন মাওলানা আকরাম খান, যিনি সরকারি অর্থ বরাদ্দ নিয়ে এই শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। ব্যারিস্টার আবদুর রসুল আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়কে মুসলমানদের জন্য 'বিলাসিতা' বলে আখ্যা দেন—তাঁর মতে কয়েকজনের জন্য অর্থ ব্যয় না করে সেটা বেশি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করাই উচিত। চব্বিশ পরগণার জেলা মহামেডান অ্যাসোসিয়েশনও ১৯১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করে, এই যুক্তিতে যে এতে গোটা প্রদেশের মুসলমানদের শিক্ষাগত স্বার্থে পক্ষপাতমূলক প্রভাব পড়বে। এমনকি মাওলানা মুহাম্মদ আলী কলকাতার 'দি কমরেড' পত্রিকায় লিখে দাবি করেন, ঢাকায় আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে আলিগড়ে প্রস্তাবিত সর্বভারতীয় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিই বেশি যুক্তিসঙ্গত।

৩. পশ্চিমবঙ্গের কিছু হিন্দু

এই অংশের আশঙ্কা ছিল একেবারে ভিন্ন প্রকৃতির—ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ কমে যাবে, ফলে সেটি পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়বে। এই ভয় থেকেই তাঁরা বিরোধিতা করেছিলেন।

যাঁরা প্রকাশ্যে বিরোধিতায় নেতৃত্ব দেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় বিরোধী হিসেবে ইতিহাসে নাম উঠে এসেছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর। লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফর শেষে কলকাতায় ফিরলে ১৯১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি হিন্দু প্রতিনিধিদল তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরুদ্ধে একটি স্মারকলিপি পেশ করে। লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদের মতে, স্মারকলিপিতে যুক্তি দেখানো হয়েছিল, পূর্ব বাংলার মুসলমানরা মূলত কৃষিজীবী, তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁদের বিশেষ কোনো লাভ হবে না।

কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হলো, শেষ পর্যন্ত লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষের কাছে জানতে চেয়েছিলেন—কিসের বিনিময়ে তিনি এই বিরোধিতা থেকে সরে আসবেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চারটি নতুন অধ্যাপক পদ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি পেয়ে তিনি বিরোধিতা প্রত্যাহার করেন, এমনকি পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগেও সহযোগিতা করেন।

রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই বিরোধিতা করেছিলেন?

এই প্রশ্নটি বহু বছর ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। অভিযোগের সূত্রপাত মূলত ২০০০ সালে প্রকাশিত মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিনের একটি বই থেকে, যেখানে দাবি করা হয় ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়বিরোধী এক জনসভা হয়েছিল।

কিন্তু ইতিহাসের তথ্য-প্রমাণ এই দাবিকে সমর্থন করে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষসহ একাধিক গবেষক দেখিয়েছেন, ঠিক সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় ছিলেনই না। ১৯১২ সালের ১৯ মার্চ তাঁর জাহাজে করে ইংল্যান্ড যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যাত্রার দিন সকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় সে যাত্রা বাতিল হয়ে যায়। এরপর বিশ্রামের জন্য ২৪ মার্চ তিনি শিলাইদহে চলে যান এবং ২৮ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে ১৮টি গান-কবিতা রচনা করেন। রবীন্দ্র-গবেষক প্রশান্তকুমার পালের 'রবিজীবনী' গ্রন্থেও এই সময়কালের বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়—চিঠিপত্র, কবিতা রচনার তারিখ, এমনকি ঠাকুরবাড়ির হিসাবের খাতা পর্যন্ত। অর্থাৎ যেদিন তাঁর কলকাতার গড়ের মাঠে সভাপতিত্ব করার কথা বলা হচ্ছে, সেদিন তিনি ছিলেন শিলাইদহে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশি বছর' বইতেও এই অভিযোগের কোনো উল্লেখ নেই। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের ২০১১ সালের বার্ষিক অধিবেশনেও বিষয়টি আলোচনায় আসে, যেখানে অধ্যাপক ফকরুল আলম মন্তব্য করেন—রবীন্দ্রনাথ শুরুতে বঙ্গভঙ্গের বিরোধী থাকলেও পরবর্তীতে অবস্থান বদলেছিলেন, এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সেখানে সম্মাননা নিতে গিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই তাঁকে সেখানে ভাষণ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়, এবং ১৯৩৬ সালে তাঁকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধিও দেওয়া হয়—কেউ বিরোধিতা করেননি। ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানেও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে—রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতার দাবিটি ভিত্তিহীন প্রচারণা মাত্র।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তৌহিদুল হকের ভাষায়, রবীন্দ্রনাথকে যদি কোনোভাবে বিরোধী তালিকায় রাখতেই হয়, তবে তাঁকে রাখতে হবে তৃতীয় সারিতে—কারণ তাঁর সঙ্গে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর মতো ব্যক্তিদের একাধিকবার বৈঠক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই আলোচনার বিষয়বস্তু বিশ্ববিদ্যালয়বিরোধিতা ছিল—এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই।

যাঁরা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন

বিরোধিতার এই জটিল ইতিহাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁদের কথাও উল্লেখযোগ্য। সবচেয়ে বড় নাম ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, যিনি এই দাবি সবার আগে জোরালোভাবে তুলে ধরেন। ১৯১৫ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী দৃঢ়তার সঙ্গে এই উদ্যোগের হাল ধরেন—নিজের জমিদারির একটি বড় অংশ বিক্রি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল গঠনেও ভূমিকা রাখেন তিনি। এছাড়া শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের অবদানও উল্লেখযোগ্য।

পূর্ব বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু ব্যক্তিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছিলেন—তাঁদের মধ্যে ঢাকার বালিয়াটির জমিদার অন্যতম, যাঁর পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামেই পরবর্তীতে জগন্নাথ হলের নামকরণ করা হয়।

দীর্ঘ বিতর্ক, স্মারকলিপি আর দর-কষাকষির মধ্য দিয়ে ১৯২০ সালে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট' পাস হয় এবং পরের বছর প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয় তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ইতিহাসের এই জটিল অধ্যায় প্রমাণ করে, কোনো বড় প্রতিষ্ঠান একদিনে বা সহজে গড়ে ওঠে না—এর পেছনে থাকে নানা পক্ষের স্বার্থ, আশঙ্কা আর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp