ভারতের হায়দরাবাদ দখল

ভারতের হায়দরাবাদ দখল
স্বাধীন সার্বভৌমত্বের ওপর এক ঐতিহাসিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত

১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও দেশভাগের পর নতুন দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়—ভারত ও পাকিস্তান। তবে এর বাইরেও প্রায় সাড়ে পাঁচশ দেশীয় রাজ্য (Princely States) ছিল, যাদের ব্রিটিশ ভারত ত্যাগের আগে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনি অধিকার দেওয়া হয়েছিল। তারা চাইলে ভারতে যোগ দিতে পারত, পাকিস্তানে যোগ দিতে পারত, কিংবা সম্পূর্ণ স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারতো। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে ধনকুবের ও প্রভাবশালী শাসক ছিলেন হায়দরাবাদের শেষ নিজাম মীর ওসমান আলী খান। তিনি তার রাজ্যকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু নিজামের সেই স্বাধীন সত্তার স্বপ্নকে ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক নীতি কঠোর আগ্রাসনের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেয়।

হায়দরাবাদের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিজামের অবস্থান

হায়দরাবাদ রাজ্যটি আয়তনে ও অর্থনীতিতে তৎকালীন অনেক ইউরোপীয় দেশের চেয়ে বড় ছিল। এর নিজস্ব মুদ্রা, ডাক ব্যবস্থা, রেলওয়ে এবং নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল। ভৌগোলিকভাবে এটি ভারতের মাঝখানে অবস্থিত হলেও নিজাম কোনো পক্ষেই যোগ না দিয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।

১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে ভারত সরকার ও হায়দরাবাদের নিজামের মধ্যে একটি 'স্ট্যান্ডস্টিল অ্যাগ্রিমেন্ট' বা ‘স্থিতাবস্থা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল এক বছরের জন্য চুক্তি পূর্ববর্তী সব ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা। কিন্তু তৎকালীন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ভারত ভূখণ্ডের ভেতরে এমন একটি বিশাল স্বাধীন রাজ্যকে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে বলা হয়েছিল "ভারতের পেটের ভেতরের এক বিষফোঁড়া"।

আগ্রাসনের অজুহাত ও তথাকথিত 'অপারেশন পোলো'

স্থিতাবস্থা চুক্তি বজায় থাকা সত্ত্বেও ভারত সরকার হায়দরাবাদের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে এবং সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। হায়দরাবাদে নিজাম সমর্থিত 'রাজাকার' নামক একটি আধাসামরিক বাহিনী এবং কমিউনিস্টদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ সহিংসতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ভারত সরকার সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করে।

বিশ্বের চোখ ধাঁধাতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্ষোভ এড়াতে এই সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘পুলিশ অ্যাকশন’ (Operation Polo)। অথচ বাস্তবে এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি সামরিক আক্রমণ, যেখানে ভারতের স্থলবাহিনীর বিশাল বহর এবং বিমান বাহিনীকে একযোগে ব্যবহার করা হয়।

১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮: সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ

১৯৪৮ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর ভারতের সামরিক বাহিনী চারদিক থেকে হায়দরাবাদ আক্রমণ করে। মেজর জেনারেল জে. এন. চৌধুরীর নেতৃত্বে ভারতীয় সৈন্যবাহিনী অত্যাধুনিক অস্ত্র, সাঁজোয়া যান ও যুদ্ধবিমান নিয়ে হায়দরাবাদের সীমান্তে প্রবেশ করে।

হায়দরাবাদের সেনাবাহিনী ও রাজাকারেরা সামরিক সক্ষমতায় ভারতের সুসংগঠিত সামরিক শক্তির তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল ছিল। ফলে মাত্র পাঁচ দিন (১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) স্থায়ী এই একপাক্ষিক যুদ্ধে হায়দরাবাদের বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর নিজাম যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন।

মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পণ্ডিত সুন্দরলাল রিপোর্ট

অপারেশন পোলো কেবল সামরিক দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি রূপ নিয়েছিল এক ভয়াবহ মানবীয় বিপর্যয়ে। দখলের পর এবং দখল চলাকালীন সময়ে হায়দরাবাদের সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক সহিংসতা, লুণ্ঠন ও গণহত্যার ঘটনা ঘটে।

পরবর্তীকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নির্দেশে পরিস্থিতি তদন্তে ‘পণ্ডিত সুন্দরলাল কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটির গোপন প্রতিবেদন দীর্ঘ কয়েক দশক লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে তা প্রকাশ পেলে দেখা যায়, ওই অভিযানে এবং তার পরবর্তী সহিংসতায় আনুমানিক ২৭,০০০ থেকে ৪০,০০০ (কিছু কিছু বেসরকারি হিসাবে লাখেরও বেশি) নিরপরাধ মানুষ নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল। একটি স্বাধীন ভূখণ্ডকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে গিয়ে এমন গণহত্যা ইতিহাসের পাতায় ভারতীয় আগ্রাসনের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

একটি ভূখণ্ডের জোরপূর্বক বিলোপ

আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি লঙ্ঘন করে সামরিক শক্তির জোরে হায়দরাবাদকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিজামকে তার ক্ষমতা থেকে সরিয়ে রাজ্যটিকে একটি ভারতীয় প্রদেশে পরিণত করা হয়।

হায়দরাবাদ দখল ছিল নগ্ন আঞ্চলিক আগ্রাসনের একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে, তৎকালীন ভারতের সীমানা বিস্তারের নীতিতে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের চেয়ে সামরিক শক্তির প্রয়োগকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় এটি কেবল একটি রাজ্য দখলের গল্প নয়, বরং কূটনৈতিক চুক্তি ও মানবিক অধিকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আগ্রাসনের ঐতিহাসিক রূপরেখা।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp