সকালে ঘুম ভাঙার পর প্রথম যে জিনিসটা হাতে নিই, সেটা মোবাইল ফোন। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও শেষ যা দেখি, তা-ও এই একই স্ক্রিন। মাঝখানে কতবার যে ফোনের দিকে তাকাই, তার হিসাব রাখাও কঠিন। ব্যাপারটা এখন আর নিছক "ফোন প্রীতি" নয়—এটা একরকম নেশায় রূপ নিয়েছে, আর সেই নেশা মাঝে মাঝে এমন ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে যে মানুষ একটা ফোনের জন্য খুন করতেও পিছপা হচ্ছে না।
কেন ফোন ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারি না
আসলে ব্যাপারটা শুধু ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা নয়, এর পেছনে মস্তিষ্কের রসায়নও কাজ করে। প্রিয় কোনো গান শোনা, পছন্দের গেম খেলা বা কোনো কঠিন কাজ শেষ করার পর মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা বেড়ে যায়, যার কারণে ভালো লাগে এবং কাজটা আবার করতে ইচ্ছা করে। ফোনের নোটিফিকেশন, লাইক, মেসেজ—প্রতিটাই আসলে ছোট ছোট ডোপামিন হিট, আর মস্তিষ্ক এই হিটের প্রতি দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে যায়।
এই অভ্যস্ততা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে বিশেষজ্ঞরা এখন একে "নোমোফোবিয়া" নামে আলাদা একটা সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন—অর্থাৎ ফোন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ভয়। ২০১৭ সালে ভারতে মেডিকেলের প্রথম বর্ষের ১৪৫ জন শিক্ষার্থীর ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, প্রায় ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থীই কোনো না কোনো মাত্রায় নোমোফোবিয়ায় ভুগছিলেন—কারও মাঝারি, কারও তীব্র। সংখ্যাটা আট বছর আগের, এখনকার চিত্র নিশ্চয়ই আরও ভয়াবহ।
প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের সংযোগ এতটাই গভীর হয়ে গেছে যে কিছুক্ষণ ফোন থেকে দূরে থাকলেই মনে হয়—এই বুঝি কিছু একটা মিস করে ফেললাম। এই আশঙ্কা থেকেই অনেকে কোনো নোটিফিকেশন না এলেও প্রতি ১৫ মিনিটে একবার ফোন চেক করেন।
শিশু-কিশোরদের মধ্যে সমস্যাটা আরও গভীর
শুধু বড়রাই নন, শিশুরাও এই আসক্তির বাইরে নেই। গবেষণা বলছে, বাবা-মায়ের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় না কাটানো, খেলার মাঠ ও সঙ্গীর অভাব, আর ফোনে কার্টুন-গেমের সহজলভ্যতা—এসব মিলিয়েই শিশুরা স্মার্টফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফল হিসেবে দেখা যাচ্ছে অকারণ রাগ, ঘুমের সমস্যা, অমনোযোগিতা, ভাষার দক্ষতা ঠিকমতো গড়ে না ওঠা, এমনকি পরিবার-পরিজন থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতাও।
যখন আসক্তি অপরাধে রূপ নেয়
এখানেই বিষয়টা সবচেয়ে উদ্বেগজনক জায়গায় পৌঁছায়। ফোন যখন শুধু একটা যন্ত্র নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের একটা অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটা হারানোর ভয়, বা অন্যের ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার লোভ—দুটোই মানুষকে চরম পথে ঠেলে দিতে পারে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই আশঙ্কাকেই সত্যি প্রমাণ করছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহযোগী অধ্যাপকের ছেলে, সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতীমকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা—ছেলেটির আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই নৃশংস ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। এর কিছুদিন আগে, ১১ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে মোবাইল ফোন নিয়ে বিরোধের জেরে রাব্বী নামে ২৫ বছর বয়সী এক যুবককে খুন করা হয়। এর আগেও মোহাম্মদপুরে ছিনতাই করা মোবাইল ফোন নিয়ে বিরোধ থেকে খুনের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে কিশোর গ্যাংয়ের জড়িত থাকার তথ্যও উঠে এসেছিল।
এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে রাখলে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একটা ফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা, আত্মপরিচয় আর তাৎক্ষণিক আনন্দের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আর ঠিক এই কারণেই একে ঘিরে সহিংসতার মাত্রাও বাড়ছে।
সমাধান কোথায়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরোপুরি ফোন এড়িয়ে চলা বাস্তবসম্মত নয়, বরং সচেতনভাবে ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলাটাই আসল কাজ। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, স্ক্রিনটাইম ট্র্যাক করা, আর প্রয়োজনে কাছের মানুষের সঙ্গে সমস্যাটা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা—এগুলো ছোট কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা আর প্রাপ্তবয়স্কদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ—দুটোই সমান জরুরি।
কিন্তু সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যখন একটা ফোনের জন্য মানুষ প্রাণ পর্যন্ত কেড়ে নিতে দ্বিধা করছে না, তখন শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়—এখানে দরকার আইনশৃঙ্খলার কঠোর নজরদারি, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পারিবারিক ও সামাজিক উদ্যোগ, আর সর্বোপরি প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা নতুন করে ভাবা।