বাব আল-মান্দাব প্রণালী এক সরু জলপথের বৈশ্বিক সমীকরণ

বাব আল-মান্দাব প্রণালী এক সরু জলপথের বৈশ্বিক সমীকরণ
মানচিত্রে তাকালে ইয়েমেন আর হর্ন অব আফ্রিকার মাঝের এই সরু জলপথটাকে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে না। মাত্র ২৯ কিলোমিটার চওড়া একটা প্রণালী—অথচ এই সামান্য জায়গাটুকু নিয়েই এখন বিশ্ব অর্থনীতি আর ভূ-রাজনীতির হিসাব-নিকাশ পাল্টে যাচ্ছে। লোহিত সাগর আর এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে থাকা বাব আল-মান্দাব আজ পরিণত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল ফ্ল্যাশপয়েন্টে।

​নামকরণের ঐতিহাসিক পটভূমি

​আরবি ভাষায় 'বাব আল-মান্দাব'-এর আক্ষরিক অর্থ "কান্নার দুয়ার" বা "অশ্রুর দ্বার"। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ঐতিহাসিকভাবে এই জলপথের প্রবল স্রোত ও অনিশ্চিত আবহাওয়া অসংখ্য নৌযান ডুবির কারণ হয়েছে। প্রচলিত একটি আরব লোকগাঁথা অনুযায়ী, প্রাচীনকালে এক ভয়াবহ ভূকম্পনে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশ পৃথক হয়ে যাওয়ার সময় যে বিপুল প্রাণহানি ঘটেছিল, সেই স্মৃতির ধারাবাহিকতাতেই এই নামকরণ।

​বৈশ্বিক বাণিজ্যে গুরুত্ব ও অবস্থান

উত্তর-পূর্বে ইয়েমেন, দক্ষিণ-পশ্চিমে জিবুতি ও ইরিত্রিয়া—এই দুই তীরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাব আল-মান্দাব আসলে সুয়েজ খালমুখী যাত্রার প্রবেশদ্বার। ভারত মহাসাগর বা এডেন উপসাগর থেকে ইউরোপের দিকে যেতে চাইলে যেকোনো জাহাজকে এই পথ পেরোতেই হয়। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হওয়ার পর থেকেই এই রুট এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সমুদ্রপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

​পরিসংখ্যান সংক্ষেপে এর বৈশ্বিক প্রভাবকে স্পষ্ট করে:

​সমুদ্রপথে বাহিত বিশ্ব তেলের প্রায় ১২ শতাংশ এবং বৈশ্বিক এলএনজি (LNG) পরিবহনের ৮ শতাংশ এই রুটনির্ভর। এখান দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মোট পণ্যের প্রায় ১০ শতাংশ এই একক প্রণালী দিয়েই যাতায়াত করে।

হুতিদের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক মাত্রা

ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিরা দীর্ঘদিন ধরেই লোহিত সাগর উপকূলের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছিল। সেপ্টেম্বরের শুরুতে তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করে নেয়, এরপর একে একে ধুবাব উপকূল আর হানিশ দ্বীপপুঞ্জও তাদের হাতে চলে আসে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসে যখন প্রণালীর ঠিক মাঝখানে থাকা কৌশলগত ময়উন দ্বীপ (পেরিম নামেও পরিচিত) থেকে সরকারি বাহিনী প্রত্যাহারের পর হুতি যোদ্ধারা সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এই দ্বীপটাই আসলে পুরো খেলার চাবিকাঠি—এখান থেকেই গোটা জলপথের ওপর নজরদারি করা সম্ভব, কারণ এটি প্রণালীকে দুই ভাগে ভাগ করে রেখেছে।

এর ফলে এখন কার্যত পুরো বাব আল-মান্দাব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে। তবে মজার ব্যাপার হলো, তারা প্রকাশ্যে দাবি করছে—সৌদি আরব ছাড়া বাকি সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য এই পথ সম্পূর্ণ নিরাপদ। সৌদি জাহাজের ওপর তাদের নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে, উত্তরাঞ্চলে সরকারি অবরোধের প্রতিশোধ হিসেবে।

​হরমুজ প্রণালী সংকট ও বিকল্প রুটের চাপ

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট বুঝতে হলে হরমুজ প্রণালীর প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের জেরে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে রেখেছে, যেটা দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। ফলে সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বিকল্প রুট হিসেবে লোহিত সাগরের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

সৌদি আরব তাদের "ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন" দিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাচ্ছে, আর সেখান থেকে বাব আল-মান্দাব হয়েই তা এশিয়ার বাজারে যাচ্ছে। হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর এই পাইপলাইনের ব্যবহার রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে এখন দুটো প্রণালীই যদি একসঙ্গে অকার্যকর হয়ে যায়, তাহলে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ একসঙ্গে থমকে যাবে—এমন আশঙ্কাই করছেন বিশ্লেষকরা।

সামুদ্রিক ঝুঁকি ও ইরানের ভূমিকা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামুদ্রিক মাইন ও আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে হুতিদের এই অঞ্চলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটানোর পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ অবরোধ না করেও কেবল প্রতীকী আক্রমণের মাধ্যমেই তারা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত দীর্ঘ পথ নির্বাচনে বাধ্য করতে পারে। পূর্বে কার্গো জাহাজ জব্দ ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাগুলো তাদের এই সক্ষমতারই সামুদ্রিক নজির।

বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি ইরানের সমন্বিত আঞ্চলিক কৌশলেরই অংশ। ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের ওপর বিভিন্ন ফ্রন্টে চাপ সৃষ্টি করা এবং আঞ্চলিক সংঘাত এড়িয়ে চলা সৌদি আরবকে সরাসরি প্রতিক্রিয়ায় বাধ্য করাই হতে পারে তেহরানের অন্যতম লক্ষ্য। ইতোমধ্যেই সৌদি আরবের ভেতরে মূল পাইপলাইনে হামলার পর অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিয়াদ মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।

অবরোধের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব

বাব আল-মান্দাব পূর্ণাঙ্গভাবে অবরুদ্ধ হলে তার জের টানতে হবে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে:

•রুট পরিবর্তন ও পরিচালন ব্যয়: জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত অর্থাৎ 'কেপ অব গুড হোপ' ঘুরে যাতায়াত করতে হবে। এতে যাত্রার সময় ১০ থেকে ১৫ দিন বৃদ্ধি পাবে এবং জ্বালানি খরচ বাড়বে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।

•​মূল্যস্ফীতি: পরিবহন ও বিমা মাশুল বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যে, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করবে।

•​সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়া: 'জাস্ট-ইন-টাইম' উৎপাদন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল স্বয়ংক্রিয় যান (অটোমোবাইল), ইলেকট্রনিক্স ও টেক্সটাইল খাত কাঁচামালের অভাবে মারাত্মক সংকটে পড়বে।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এই পরিস্থিতিকে "দুঃস্বপ্নতুল্য" আখ্যা দিয়ে বলেছেন, হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাবেও যদি একই মাত্রার অবরোধ তৈরি হয়, তাহলে ইউরোপের সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা কেবল ক্ষতিগ্রস্তই হবে না, পুরোপুরি অচলও হয়ে যেতে পারে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্টের সঙ্গে তুলনা

বিশ্বে কৌশলগত সামুদ্রিক চোকপয়েন্টের সংখ্যা কয়েক শতাধিক হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সত্যিকারের প্রভাব ফেলার মতো এমন পথ দুই ডজনের বেশি নয়। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালী সবচেয়ে বড় জ্বালানি ঝুঁকির জায়গা, মালাক্কা প্রণালি এশিয়ান বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র, তাইওয়ান প্রণালি পূর্ব এশিয়ার প্রযুক্তি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ, আর বাব আল-মান্দাব হয়ে উঠেছে এশিয়া-ইউরোপ সরবরাহ শৃঙ্খলের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিন্দু। এই প্রণালিগুলোর যেকোনো একটায় সংকট তৈরি হলে তার ঢেউ গিয়ে লাগে বিশ্বের প্রতিটি কোণে।

বাব আল-মান্দাব আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে যেকোনো দিকেই মোড় নিতে পারে পরিস্থিতি। হুতিদের হাতে এখন যে কৌশলগত সুবিধা তৈরি হয়েছে, সেটা তারা কতটা ব্যবহার করবে—নাকি সৌদি আরব বা আন্তর্জাতিক মহলের বড় ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া এড়াতে সংযত থাকবে—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট: এই সরু জলপথের ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বের জ্বালানি বাজার, সরবরাহ ব্যবস্থা আর কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp