চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দুটি নির্ণায়ক কৌশলগত অধ্যায়
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং তার পরিণতিতে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই আন্দোলনের সাফল্য কেবল সাধারণ মানুষের ক্ষোভের ওপর নির্ভর করেনি; বরং এর পেছনে ছিল ধারাবাহিক ও পর্যায়ক্রমিক কিছু কর্মসূচি, যেগুলো আন্দোলনকে ধাপে ধাপে সরকার পতনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই কর্মসূচিগুলোর মধ্যে ‘বাংলা ব্লকেড’ এবং ‘মার্চ টু ঢাকা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বাংলা ব্লকেড: প্রশাসনিক ও পরিবহন-ব্যবস্থা অচল করার কর্মসূচি
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলন যখন কেবল সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদানের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর রূপ নেয়, তখন ১০ জুলাই ২০২৪ থেকে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি কার্যকর হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের ডাকে ওই দিন বিকেল থেকে2 রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও মহাসড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
‘বাংলা ব্লকেড’ নামটি মূলত অসহযোগ আন্দোলনের ঐতিহাসিক ধারণা এবং আন্তর্জাতিক অবরোধ কৌশলের একটি স্থানীয় রূপ। এর মূল লক্ষ্য ছিল সরাসরি সহিংসতার পথে না গিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা ।
এই কর্মসূচির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লক্ষণীয়। প্রথমত, ঢাকার শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, মহাখালী, ফার্মগেটসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং দেশের প্রধান মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধের ফলে পণ্য পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে, যা সরকারের ওপর অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয়ভাবে একটি স্থানে জমায়েত না হয়ে ঢাকার একাধিক প্রবেশমুখ এবং ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মহাসড়কে একযোগে অবরোধ কর্মসূচি পালিত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে একক স্থানে শক্তি প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, এই কর্মসূচির অহিংস ও বেসামরিক চরিত্র আন্দোলনকে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা এনে দেয়—সাধারণ মানুষের চলাচলে ভোগান্তি সৃষ্টি হলেও অনেকেই আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, যা আন্দোলনটিকে কেবল ছাত্র আন্দোলন থেকে ক্রমে গণআন্দোলনে রূপান্তরিত করে।
মার্চ টু ঢাকা: রাজধানীমুখী চূড়ান্ত কর্মসূচি
জুলাই মাস জুড়ে আন্দোলনের বিস্তার, দমন-পীড়ন এবং প্রাণহানির পটভূমিতে ৩ আগস্ট ২০২৪ শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে আন্দোলনকারীরা সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। এর ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট থেকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়, যে দিন দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং সরকার দ্বিতীয় দফায় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়।
প্রাথমিকভাবে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি বিবেচনায় সমন্বয়করা ৪ আগস্ট রাতে এক জরুরি ঘোষণায় কর্মসূচিটি একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করেন।
রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র সাধারণত রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনের শেষ ধাপ হিসেবে ঢাকামুখী বিপুল জনসমাগম ঘটানোই ছিল এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।
এই কর্মসূচির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য। কারফিউ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন, যার মাধ্যমে সরকারের যোগাযোগ-নিয়ন্ত্রণ কৌশল কার্যকারিতা হারায়। ব্যাপক সংখ্যায় মানুষের উপস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগের সক্ষমতাকে সীমিত করে দেয় বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। পাশাপাশি নির্ধারিত তারিখ একদিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তটি প্রশাসনকে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় থেকে বঞ্চিত করে, যা পরিস্থিতিকে দ্রুত পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দেয় । অবশেষে ৫ আগস্ট ২০২৪ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশত্যাগ করেন ।
দুই কর্মসূচির তুলনামূলক তাৎপর্য
বাংলা ব্লকেড ও মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি দুটি একে অপরের পরিপূরক হলেও তাদের লক্ষ্য ও প্রকৃতিতে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল। বাংলা ব্লকেডের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম অচল করে দীর্ঘমেয়াদী চাপ তৈরি করা, যা মূলত অবস্থান ধর্মঘট ও সড়ক-রেলপথ অবরোধের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল এবং যাতে গ্রেপ্তার, লাঠিচার্জ বা টিয়ারশেলের মতো ঝুঁকি ছিল। অন্যদিকে মার্চ টু ঢাকার লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রে সরাসরি বিপুল জনসমাগম ঘটিয়ে সরকার পতন ত্বরান্বিত করা; এটি ছিল একমুখী রাজধানীমুখী অভিযাত্রা, যেখানে কারফিউ ভঙ্গ ও সরাসরি বলপ্রয়োগের ঝুঁকি ছিল অনেক বেশি।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বাংলা ব্লকেড সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে ফেলেছিল, আর মার্চ টু ঢাকা প্রশাসনের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে একবারে ভেঙে দিয়েছিল।
আন্দোলনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি
এই দুটি কর্মসূচি ছাড়াও আন্দোলনের সাফল্যে আরও কিছু পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৮ জুলাই ২০২৪ থেকে ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সহিংসতা ও ইন্টারনেট বন্ধের প্রেক্ষাপটে দেশব্যাপী কার্যক্রম স্থবির করে দেয়, যা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ কর্মজীবী মানুষকেও আন্দোলনে যুক্ত করে। এরপর ৩ আগস্ট শহীদ মিনার থেকে ঘোষিত এক দফা দাবি আন্দোলনকে একটি সুনির্দিষ্ট চূড়ান্ত লক্ষ্যে পরিণত করে, যা পরবর্তী সময়ে মার্চ টু ঢাকার ভিত্তি তৈরি করে।
বাংলা ব্লকেড এবং মার্চ টু ঢাকা ছিল সুপরিকল্পিত ও পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচি, যেগুলো আন্দোলনকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হয়েছিল। বাংলা ব্লকেডের মাধ্যমে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত করে জনসম্পৃক্ততা তৈরি হয়, আর মার্চ টু ঢাকার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ক্ষমতার কেন্দ্রে সমবেত হয়ে চূড়ান্ত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। ২০২৪ সালের এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে গণআন্দোলন ও কৌশলগত প্রতিরোধের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।