জুলাইয়ের ক্ষত
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অধ্যায় হলেও, এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া হাজারো তরুণ-তরুণীর জীবনে তা রেখে গেছে দীর্ঘস্থায়ী এক ক্ষত। সরকারি হিসাবে আন্দোলনে শহীদের সংখ্যা বর্তমানে ৮৪৩ এবং আহতের সংখ্যা ১৪,৩৭০ বলে জানা গেছে; আর জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, নিহতের সংখ্যা ১,৪০০ জনেরও বেশি হতে পারে । তবে সংখ্যার আড়ালে যে বাস্তবতা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়, তা হলো—প্রায় বাইশ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন, যাদের একটি বড় অংশ চিরতরে হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি, হাত-পা কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপনের সামর্থ্য । দুই বছর পার হয়ে গেলেও এই তরুণদের অনেকেই এখনো হাসপাতালের বিছানায়, অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায়, কিংবা মনের গভীরে জমাট বাঁধা আতঙ্কের সঙ্গে লড়াই করছেন।
শারীরিক ক্ষতির বিস্তার: চোখ, হাত-পা ও স্থায়ী পঙ্গুত্ব
জুলাই গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী সরকারি তালিকায় আহতদের সংখ্যা ১৪,৩৭০ এবং শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ বলা হয়েছে; একই সঙ্গে ২০২৪ সালের শেষ দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় আহতের সংখ্যা ১১,৩০৬ এবং পরে ১২,৩৮০ পর্যন্ত হালনাগাদ হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল, যা তালিকা-হালনাগাদের চলমান প্রকৃতিকে দেখায় । আহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন চোখে আঘাতপ্রাপ্তরা—বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ছররা গুলিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ চোখে আঘাত পান, এবং অনেকেই এক বা দুই চোখের দৃষ্টি হারান ।
দেরিতে চিকিৎসা পাওয়া কিংবা গুরুতর আঘাতের কারণে অনেকের হাত বা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। ঢাকার মোহাম্মদপুরের ব্র্যাক লিম্ব সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত কয়েক ডজনকে কৃত্রিম পা ও হাত সংযোজন এবং বিভিন্ন সহায়ক উপকরণ দেওয়া হয়েছে—এ ধরনের পুনর্বাসন কার্যক্রম চলমান রয়েছে । জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সূত্র বলছে, বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী হাজারো মানুষকে আহত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, এবং গেজেটভিত্তিক শ্রেণিকরণও করা হয়েছে ।
গুরুতর আহতদের একটি অংশকে দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুদানে বাস্তবায়িত সহায়তা-কার্যক্রমের পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থায়ও বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে; বিভিন্ন সময়ে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ একাধিক দেশে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে । চিকিৎসা বাবদ সরকারের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য, যা এই সংকটের মাত্রা নির্দেশ করে ।
মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট
শারীরিক ক্ষতির চেয়ে কম আলোচিত হলেও, আহতদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা উদ্বেগজনক বলে গবেষকরা বলছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২১৭ জন আহতের মধ্যে ৮২.৫ শতাংশ বিষণ্নতায় এবং ৬৪.১ শতাংশ পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে (পিটিএসডি) আক্রান্ত । এই ফলাফল আহত তরুণদের মধ্যে মানসিক বিপর্যয়ের গভীরতা তুলে ধরে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ গুরুতর বিষণ্নতা ও গুরুতর পিটিএসডিতে ভুগছেন । গবেষণাটির নেতৃত্বদানকারী বিএমইউর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল আহসান জানান, বহু আহত ব্যক্তি কয়েক দিন পর্যন্ত বিনা চিকিৎসায় ছিলেন, কারণ গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেকে হাসপাতালে যেতে পারেননি, বিশেষত সাভার ও আশুলিয়ায় পুলিশি বাধার মুখে পড়া ব্যক্তিরা । সে সময় বেঁচে থাকা ও চিকিৎসা পাওয়াই ছিল মুখ্য লক্ষ্য, মানসিক স্বাস্থ্যের কথা তখন কারও মাথায় আসেনি ।
গবেষণায় আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক উঠে এসেছে—গ্রামাঞ্চলের আহতদের মধ্যে বিষণ্নতা ও পিটিএসডির হার শহরের তুলনায় বেশি, কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সহায়তার নেটওয়ার্ক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গ্রামে অনেক সীমিত । পিটিএসডি আক্রান্তদের প্রায় সবাই একই সঙ্গে বিষণ্নতায়ও ভুগছেন, যা এই দুই সমস্যার গভীর আন্তঃসম্পর্ক নির্দেশ করে ।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভর্তি রোগীদের নিয়ে পরিচালিত আরেকটি মূল্যায়নে চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। ৫৪ জন ভর্তি রোগীর ওপর মানসম্মত মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ পিটিএসডিতে, ২৬ জন চরম মাত্রার বিষণ্নতায় এবং ২৪ জন চরম উদ্বেগে আক্রান্ত । আরও উদ্বেগের বিষয়, এই মূল্যায়নে অংশ নেওয়াদের ৬৩ শতাংশ বিভিন্ন মাত্রার আত্মহত্যার চিন্তা করছেন বলে জানা গেছে, যাদের মধ্যে ১১ জনের আত্মহত্যামূলক আচরণ গুরুতর পর্যায়ের এবং ৪ জন অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে চিহ্নিত হয়েছে ।
চোখে আঘাতপ্রাপ্ত তরুণদের নিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের একটি পৃথক গবেষণায়ও একই রকম চিত্র মেলে—৫৫ জন তরুণের প্রায় ৭৫ শতাংশ হালকা থেকে গুরুতর বিষণ্নতায় ভুগছেন, যার মধ্যে ২৫ শতাংশের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর ।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আড়ালে যে যন্ত্রণা
পরিসংখ্যানের বাইরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে ঠোঁট, মাড়ি, তালু, নাক ও বাঁ চোখ হারানো গাড়িচালক খোকন চন্দ্র বর্মণ আয়নায় নিজেকে দেখতে ভয় পান বলে জানিয়েছেন। রাশিয়ায় উন্নত চিকিৎসার পরও তার মুখের অবয়ব আগের মতো ফেরেনি, আর শিশু-বড় সবাই তাকে দেখলে ভয় পায় বলেও তিনি জানান ।
উত্তরার আজমপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়া রকিব উদ্দিন—যিনি এখন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী—একাধিক বড় অস্ত্রোপচারের পরও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি; রাতে ঘুমাতেও তার কষ্ট হয় বলে জানা গেছে । মিরপুরে ছররা গুলিতে চোখ হারানো তখনকার স্কুলছাত্র সাকিব হাসানের ঘটনাও পরিবারের জন্য ছিল আরেক দুঃসহ অভিজ্ঞতা । পুলিশের ভয়ে প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসিতে চিকিৎসা করানো হয় তাকে, পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়া হয়; প্রথমবার হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় দীর্ঘ সময় সে কথা বলেনি । সিলেটে আহত হয়ে চোখ হারানো উনিশ বছর বয়সী মিজান আহমেদ জানিয়েছেন, শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিকভাবেও কঠিন সময় পার করেছেন তিনি, তবে বিভিন্ন কর্মশালায় অংশ নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ পেয়ে কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন ।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
আহতদের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সরকার তাদের শারীরিক ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে সহায়তা কাঠামো তৈরি করেছে। সবচেয়ে গুরুতর আহত—যাদের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি, হাত-পা বা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে—তাদের ‘ক’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে; এই শ্রেণির আহতদের জন্য মাসিক ভাতা ও এককালীন আর্থিক সহায়তা নির্ধারণ করা হয়েছে । ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির আহতদের জন্যও ভাতা ও এককালীন সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে ।
এর পাশাপাশি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিচালিত ‘দগ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন’ নীতিমালা সংশোধন করে জুলাই আন্দোলনে আহতদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, আহত ব্যক্তিরা আঘাতের ধরন ও তীব্রতা বিবেচনায় অনুদান এবং স্বল্প সুদে ক্ষুদ্রঋণও নিতে পারছেন । তবে এই সুবিধা পেতে হলে নির্দিষ্ট আর্থিক যোগ্যতার শর্তও প্রযোজ্য ।
জাতীয় পর্যায়ে আহতদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও ট্রমা কেয়ার দেওয়ার কথা সরকারি মহলে বারবার বলা হয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগগুলোর মাধ্যমে কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও বিভিন্ন সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে ।
আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি সহায়তা
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠনগুলোও আহতদের পুনর্বাসনে ভূমিকা রাখছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২ মিলিয়ন ইউরো অর্থায়নে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ যৌথভাবে ‘Pathways to Healing’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যার আওতায় প্রায় ৮,০০০ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন । এই প্রকল্পে চিকিৎসা সেবা, ফিজিওথেরাপি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, চলাফেরায় সহায়ক সরঞ্জাম ও জীবিকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে ।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, শারীরিকভাবে গুরুতর আহত ও মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্তদের মর্যাদার সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতেই এই কর্মসূচি । বেসরকারি পর্যায়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশনও নিয়মিত কর্মশালার মাধ্যমে আহতদের মানসিক সহায়তা দিয়ে আসছে ।
রয়ে যাওয়া চ্যালেঞ্জ
এত উদ্যোগের পরও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আহতদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এত বড় মাত্রার ঘটনা এর আগে ঘটেনি বলে এ ধরনের রোগীদের সামলানোর মতো অবকাঠামো দেশের হাসপাতালগুলোতে ছিল না । ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আয়োজিত এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা আহতদের জন্য পৃথক মানসিক স্বাস্থ্য টাস্কফোর্স গঠন এবং একটি নতুন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ।
দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকার প্রবণতাও একটি জটিলতা তৈরি করেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার পরও অনেক আহত হাসপাতাল ছাড়তে রাজি হচ্ছেন না, যা তাদের মানসিক নির্ভরতা ও অনিশ্চয়তার একটি প্রতিফলন । এ ছাড়া গ্রামীণ এলাকার আহতদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো, দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক কলঙ্কের কারণে চিকিৎসা না নেওয়ার প্রবণতা মোকাবিলাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সময়মতো চিহ্নিত ও সমাধান করা না হলে তা কেবল ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সামগ্রিকভাবে সমাজে দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা ও পুনর্বাসনের পথে বড় বাধা তৈরি করতে পারে । জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত মানসিক স্বাস্থ্য পুনর্বাসন কর্মসূচি, বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে সংস্কৃতি-উপযোগী হস্তক্ষেপ পদ্ধতি গ্রহণের সুপারিশ করেছেন তারা ।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জুলাই বিপ্লবে আহত ও প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়া তরুণদের জীবন এখনো অনেকাংশে অসম্পূর্ণ পুনর্বাসনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে। আর্থিক সহায়তা, চিকিৎসা সুবিধা ও আন্তর্জাতিক প্রকল্পগুলো একটি কাঠামো তৈরি করলেও, প্রতিটি ব্যক্তির মানসিক ক্ষত সারিয়ে তোলা এবং তাদের মর্যাদার সঙ্গে সমাজে পুনঃঅন্তর্ভুক্ত করার কাজ এখনো দীর্ঘ পথের এক অসমাপ্ত যাত্রা ।