জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা
সাহস, আত্মত্যাগ ও অপ্রাপ্তির এক ইতিহাস

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও গণতান্ত্রিক অধিকারহরণের বিরুদ্ধে সঞ্চিত জনঅসন্তোষের বিস্ফোরণ, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতার বাস্তবতাকেই পাল্টে দেয় । এই দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে নারী সমাজের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থেকে শুরু করে শ্রমজীবী নারী, গৃহিণী, শিক্ষক, চিকিৎসক—সব শ্রেণি-পেশার নারী রাজপথে নেমে আসেন । বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের এই ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই একটি ছাত্র আন্দোলনকে প্রকৃত গণআন্দোলনে রূপান্তরিত করেছিল ।

আন্দোলনের সূচনায় নারীদের পদক্ষেপ

আন্দোলনের একটি প্রতীকী ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ও শামসুন নাহার হলের ছাত্রীদের হলের গেট ভেঙে রাজপথে নেমে আসাকে বিবেচনা করা হয়। ওই রাতেই হাঁড়ি-পাতিল, থালা-চামচ বাজিয়ে তারা প্রতিবাদ জানান, যা দ্রুত অন্যান্য হল, বুয়েট, ইডেন কলেজ ও বদরুন্নেসা কলেজসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে । এর আগে ৪ জুলাই সূর্যসেন হলে গেট তালাবদ্ধ করে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখার ঘটনাতেও নারী শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে সক্রিয় ছিলেন; পরে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হামলায় বহু নারী শিক্ষার্থী আহত হন, যা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে ।

রাজপথে নারী নেতৃত্ব

আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীরা মিছিলের অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজিদা আহমেদ তন্বী এবং গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের নারী নেত্রীদের উপস্থিতি আন্দোলনের দৃশ্যমান শক্তিকে বাড়িয়ে তোলে । বিভিন্ন প্রতিবেদনে নারীদের অংশগ্রহণের হার নিয়ে ভিন্ন মূল্যায়ন থাকলেও, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রায় সব বিভাগীয় ও জেলা শহরে নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয় । এই অংশগ্রহণ কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল না; আন্দোলনের ভৌগোলিক বিস্তৃতি নারী অংশগ্রহণের মাধ্যমেই আরও দৃশ্যমান হয় ।

শিক্ষক, চিকিৎসক ও পরিবার

আন্দোলনে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষক সমাজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংহতি আন্দোলনকে নৈতিক শক্তি জুগিয়েছিল—এমন বর্ণনা বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাওয়া যায় । চিকিৎসক ও নার্সরাও আহতদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে, গৃহিণী ও মায়েরা খাবার-পানির ব্যবস্থা করে অনন্য ভূমিকা রাখেন । শিল্পী-অভিনেত্রী সমাজের একাংশও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে রাজপথে অবস্থান নেন ।

আত্মত্যাগ ও নারী শহীদ

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নারী শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সামান্য পার্থক্য থাকলেও, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে অন্তত ১১ জন নারী নিহত হন । এই তালিকায় নাঈমা সুলতানা, রিয়া গোপ, নাফিসা হোসেন মারওয়া, সুমাইয়া আক্তার, শাহিনূর বেগম, মোসাম্মত লিজা, নাছিমা আক্তার, রিতা আক্তার, মায়া ইসলাম, মেহেরুন নেছা তানহা প্রমুখের নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাওয়া যায় । তবে পূর্ণাঙ্গ, মান্যতাপ্রাপ্ত ও এককভাবে নির্ভুল শহীদ তালিকা এখনও সর্বজনস্বীকৃতভাবে সম্পন্ন হয়নি—এ কথাও সত্য । মাত্রা, বয়স ও পেশাগত ভিন্নতা সত্ত্বেও নারীরা রাজপথে, বাসায় কিংবা কর্মস্থলে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান; অসংখ্য নারী আহত ও স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন ।

অপ্রাপ্তির বাস্তবতা

গণঅভ্যুত্থানের পরে নারীদের অবদান নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি যথেষ্ট হয়নি—এমন অভিযোগ একাধিক নারী নেত্রী ও অধিকারকর্মীর বক্তব্যে উঠে এসেছে । সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীর উপস্থিতি সীমিত ছিল; আন্দোলন-পরবর্তী উপদেষ্টা পরিষদে এবং বিভিন্ন সংস্কার প্রক্রিয়ায় নারী প্রতিনিধিত্ব প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যায়নি । একই সঙ্গে অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, চরিত্রহনন এবং নিরাপত্তাহীনতা অনেক নারীকে সক্রিয়তা থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে । ফলে আন্দোলনের সময়কার দৃশ্যমান অংশগ্রহণ আর পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মধ্যে এক ধরনের গভীর ফাঁক তৈরি হয়েছে ।

মূল্যায়ন ও প্রতিফলন

সাইফুল হক, সীমা দত্ত, শিরীন পারভিন হকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছাড়া আন্দোলন গণচরিত্র পেত না, কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজ সেই জাগরণকে স্থায়ী কাঠামোয় রূপ দিতে পারেনি। তাঁদের মতে, নারীর অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, নারীবিদ্বেষী প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অর্থবহ অংশগ্রহণ জরুরি। অনলাইনে ও অফলাইনে নারীর প্রতি বিদ্বেষ এবং রাজনীতিতে পুরুষ আধিপত্যের ধারাবাহিকতাও এই অপ্রাপ্তিকে আরও স্পষ্ট করেছে ।

নথিবদ্ধকরণ ও স্মরণ

নারীদের ঐতিহাসিক অবদান সংরক্ষণে প্রবাসে অবস্থানরত একদল নারীর উদ্যোগে ‘জুলাই বিপ্লবে মেয়েরা’ শীর্ষক একটি ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে—এটি নথিবদ্ধকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ । একই সঙ্গে ১৪ জুলাইকে ‘জুলাই কন্যা দিবস’ বা ‘জুলাই উইমেনস ডে’ হিসেবে পালনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও ড্রোন শোর মাধ্যমে নারীদের ভূমিকা স্মরণ করা হয় । তবে প্রতীকী উদ্‌যাপনের পাশাপাশি বাস্তব স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি ।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের নারী সমাজ যে সাহস, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন, তা দেশের আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা । কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, আন্দোলন-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পর্যায়ে নারীর অবদান প্রায়ই আড়াল হয়ে যায় । জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশেও এই প্রবণতা পুরোপুরি কাটেনি বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে । একটি প্রকৃত বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে হলে নারীর ঐতিহাসিক অবদানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অর্থবহ অংশগ্রহণ অপরিহার্য—এটাই এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক শিক্ষা।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp